নেপাল ট্রাজেডি
নিখোঁজ আইরিশ পরিবারের পরিচয় নিশ্চিত

নেপালে সাহু পরিবার—বাঁ দিক থেকে চতুর্থ সন্তোষ, ডান দিক থেকে চতুর্থ স্পন্দন, ডান দিক থেকে তৃতীয় সিনা এবং সাদা টি-শার্ট পরা হাঁটু গেড়ে বসা সুরভি। ছবি: দ্য মিরর
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ চার সদস্যের আইরিশ পরিবারের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজরা হলেন ৪৬ বছর বয়সী সন্তোষ সাহু, তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে স্পন্দন সাহু, স্ত্রী সুরভি মনমথ পাধি (৪৪) ও মেয়ে সিনা কুমারী সাহু (১৩)। যুক্তরাজ্যের সারেতে বসবাসকারী পরিবারটির স্বজনরা এখনো আশা করছেন, দুর্গম কোনো এলাকায় নিরাপদে আছেন তারা।
আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে পরিবারের স্বজনদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নিখোঁজ চার সদস্য জীবিত আছেন বলে এখনো আশা করছেন তারা। সন্তোষ ও স্পন্দনকে আইরিশ পাসপোর্টধারী হিসেবে উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি।
দ্য আইরিশ টাইমস ও দ্য আইরিশ নিউজ জানিয়েছে, নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকায় সন্তোষ ও স্পন্দনের নাম রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দুই নাগরিকের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহের বরফ ধস ও বিপুল পরিমাণ পানি নদী উপত্যকায় নেমে এসে সৃষ্টি করে এ বিপর্যয়ের। মুহূর্তের মধ্যে পানির স্রোত ও কাদা ভাসিয়ে নেয় সড়ক, সেতু, বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার তৎপরতাও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
সন্তোষ সাহু তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে একটি পর্যটক দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন নেপালে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পবিত্র তীর্থস্থান গোসাইকুণ্ডা ও লাংটাং জাতীয় উদ্যান এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তারা। ভ্রমণটির আয়োজন করেছিল নেপালের আলপিন ইকো ট্রেক। দ্য আইরিশ টাইমস জানিয়েছে, সন্তোষ ও স্পন্দনসহ দলটির সদস্যরা তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গিলফোর্ডের রয়্যাল গ্রামার স্কুল থেকে এ-লেভেল শেষ করেছিলেন স্পন্দন সাহু। পরিবারের বরাত দিয়ে দ্য আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট, আইটিভি নিউজ ও আইরিশ নিউজ জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রয়্যাল গ্রামার স্কুল কর্তৃপক্ষ।
বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। এএফপির ২৯ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দুই অঞ্চল মিলিয়ে অন্তত ৬৮২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ ছিলেন প্রায় ২ হাজার ৯৮০ জন। এর মধ্যে নেপালেই নিখোঁজ ছিলেন ২ হাজার ৪২৬ জন। নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
দুর্যোগের শিকার শুধু পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাই নন, নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও। বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। তবে বৃষ্টিপাত, কাদামাটি, বিধ্বস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে উদ্ধার অভিযান।
আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিই জানিয়েছে, উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি নিখোঁজদের স্বজনরা কাঠমান্ডুতে জড়ো হয়ে মরদেহের ছবি দেখে স্বজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
সন্তোষ ও স্পন্দনের পরিবারও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কোনো নিশ্চিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত তাদের স্বজনরা মৃত্যুর আশঙ্কা মেনে নিতে চাইছেন না। তাদের আশা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে হয়তো এখনো অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি এবং কোনোভাবে তারা দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছেন।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, নেপালে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা এবং নতুন করে ভূমিধস বা বন্যার আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে সন্তোষ, স্পন্দনসহ নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের স্বজনদের অপেক্ষা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যেই দীর্ঘ হচ্ছে।








