এক হাতেই মানবতার জয়

স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আল-মাসুদ লোকমান- আগামীর সময়
জন্ম থেকেই বাম হাত নেই হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের আরিছপুর গ্রামের আল-মাসুদ লোকমানের। একটি হাত না থাকলেও তার আছে অদম্য সাহস, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল এবং মানুষের উপকার করার মানসিকতা। তাই জীবনের নানা বাধা পেরিয়ে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন শত শত শিশুর স্বপ্ন নির্মাতা ও অসহায় মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।
লোকমানের জন্ম ১৯৯৫ সালের ১০ মার্চ। লোকমানরা ১০ ভাই-বোন। মা-বাবা মারা গেছেন। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে কটূক্তি ও অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হার মানেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ল’ কলেজে অধ্যয়নরত।
শিক্ষিত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১০ সালে বন্ধু মনিরুল ইসলামকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুল। মাধবপুর উপজেলার সমজদিপুরের এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৮২ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এখানে শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন ১৩ জন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। অসচ্ছল ও মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পায়। অনেকের বই, খাতা ও স্কুলের পোশাকের খরচও বহন করা হয়।
বিদ্যালয়ের বাইরেও লোকমানের মানবিক কাজ চলমান। তিনি অনেকবার রক্তদান করেছেন। অসহায় মানুষের চিকিৎসায় করছেন সহযোগিতা। সমাজের বিত্তবানদের সম্পৃক্ত করে অন্তত ১০ পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণে সহায়তা করেছেন। কারও ব্যবসার পুঁজি, কারও পড়াশোনার খরচ, আবার কারও জীবিকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
আগামীর সময়কে লোকমান বলেছেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। টিউশনি ও বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত সম্মানী, সমাজের সচ্ছল ব্যক্তি এবং প্রবাসীদের আর্থিক সহযোগিতায় যতটুকু সম্ভব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’
‘দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, অসহায়দের ঘর নির্মাণ কিংবা জীবিকার ব্যবস্থা— যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই সহযোগিতা করতে চাই। মানুষের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি’— যোগ করেন লোকমান।
লোকমানের ভাষ্য, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার মা। মানুষের অবহেলায় কষ্ট পেলে মা বলতেন, ‘আমার ছেলে একদিন মানুষের জন্য কিছু করবে।’ ২০১৫ সালে মাকে এবং কয়েক বছর পর বাবাকে হারান তিনি।
অবিবাহিত লোকমান ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে সমাজ, শিক্ষা ও মানবসেবাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। লোকমানের বড় ভাই আল-মুনসুর আবজালের ভাষ্য, ‘ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করতে পারলে সে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়।’
উত্তর সমজদিপুর গ্রামের মুদিদোকানি ইমাম হোসেন বললেন, ‘লোকমান ভাই আমাকে ব্যবসার পুঁজির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’




