মতপার্থক্য থাকলেও ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভা। ছবি: আগামীর সময়
দলীয় নেতাকর্মীদের মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য যেন ঐক্য নষ্ট না হয়। বিগত সময়ে সবাই যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, আগামীতেও সেইভাবে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। বিগত নির্বাচনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ঠিক সেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে জিতিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ঐক্য থাকলে ফ্যাসিস্ট, গুপ্ত কেউ ঢুকতে বা সুবিধা করতে পারবে না। ঐক্যে ফাটল ধরলেই তারা সবাই সুবিধা নেবে।’
সোমবার বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
গত ১৭ বছরের সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দলকে গেল ১৭ বছরে টিকিয়ে রেখেছেন। গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েও সবাই মিলে দল সামলেছেন। এই সময়ে নিজের পরিবারের চেয়ে দলের জন্য বেশি সময় দিয়েছেন, টাকা খরচ করেছেন। দলের জন্য যে টেনশন ও যন্ত্রণা নিয়েছেন, নিজের পরিবারের জন্যও কি নিয়েছেন? না। দেশের সব বিএনপি নেতাকর্মীই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখন সেই নির্যাতনের ভয় নেই। তখন সবাই সবার পাশে থেকে দল চালাতেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন কেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবেন না?’
দলের ভেতরে হাইব্রিড ও গুপ্ত অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি জানান, নির্বাচনের আগে নির্বাচন হওয়া নিয়ে হয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র। এখনও বসে আছে তারা, দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্র করছে আরেকটি গ্রুপ। দল অবশ্যই সুসংগঠিত করতে হবে। দল গোছাতে হাইব্রিড এবং গুপ্ত এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। যেন দলের নেতৃত্বে ঢুকতে না পারে তারা।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি চান, আপনাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক? তাহলে তৃণমূলে ঐক্য থাকতে হবে। তৃণমূল শক্তিশালী থাকতে হবে। আপনাদের কারণেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাচ্ছেন, সেখানে অনেক প্রস্তুতি দরকার। সেটা কি আপনাদের আছে? নাই। প্রস্তুতি না থাকলে জিততে পারবেন? না। না পারলে সরকার চলবে কেমনে? সরকার থাকতে পারবে? স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা অবশ্যই দেব। বর্ষার পর আলোচনা করে ঠিক করব। এর আগে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন, কে চেয়ারম্যান, কে সদস্য হবেন, আর কে দল চালাবেন। আমরা দলকে নিয়ে সামনে চলতে চাই, সামনে এগোতে চাই।’
আসন্ন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েকদিন পর হিন্দুদের বড় অনুষ্ঠান। এখানে যারা আছেন, তাদের বলছি, আর যারা আসেননি, তাদেরও বলবেন, তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে সফল করতে হবে। যেন কেউ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। কেউ যেন সেই সুযোগটা না পায়।’
বক্তব্যের শুরুতে গত ১৭ বছরের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে এত উন্নয়ন উন্নয়ন শুনতাম, আসলে উন্নয়নটা হয়েছে কোথায়? হয়েছে, তবে সেটা তাদের পকেটের উন্নয়ন। এখন দেখছি, সেই উন্নয়ন কোনো কাজেই আসছে না। সব ক্ষেত্রে তারা ধ্বংস করে গেছে।’
তার দাবি, উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতুর খরচ হয়েছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ একই ধরনের ভূপেন হাজারিকা সেতুর খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর প্রকল্পে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও তারা খরচ করেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রকাশিত শ্বেতপত্রে দেখানো হয়েছে, গত ১৭ বছরে প্রতি বছর ১৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।’
উন্নয়ন শুধু সড়ক নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট করা? বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে কেন? ঢাকা শহরে বড় বড় উড়ালসড়ক হয়েছে, কিন্তু খাল ও নালা ভরাট হয়েছে। তাই জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আমরা উন্নয়ন করব। উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ হাতে নিয়েছি। সারাদেশে এক হাজার শিশু হাসপাতাল করা হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাল খননসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হবে।’
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কি অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, সে সম্পর্কে আপনাদের কম ধারণা নাই, খুব ভালো ধারণাই আছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, চিকিৎসা খাতও নাজুক। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা খুবই খারাপ। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আমাদের সার্টিফিকেটের বিদেশে কোনো মূল্য নেই। এসবের জন্য জবাবদিহিতা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন হবে, মানুষ ভোট দিয়ে শাসক নির্বাচন করবে। কিন্তু গত ১৭ বছরে সেই জবাবদিহিতাও ধ্বংস করা হয়েছে।’
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড দেব, দিয়েছি। কৃষক কার্ড দেব, শুরু করেছি। যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করেছি। দায়িত্ব নেওয়ার পরই রোজা ছিল। সেই রোজায় আমরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে দিইনি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, সরবরাহ কমেছে। ফলে আমাদের আড়াই বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।’
নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি পরিবারে পাঁচজন যদি কাজ করার বদলে সবাই ঘর নোংরা করে, তাহলে একজনের পক্ষে সব পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। সবাই মিলে ঘর পরিষ্কার রাখলে কাজ সহজ হয়। দেশও একটি পরিবারের মতো। আপনারা এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তাই সবাইকে বুঝেশুনে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’




