প্রাথমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষক পদ
৪ মাসে ২০০০ বদলি চক্রের পকেটে ৬০ কোটি

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বেশ তৎপর হয়ে ওঠে শিক্ষা খাতের ‘বদলি-বাণিজ্যে’র একটি চক্র। টার্গেট, কম সময়ে অন্তত ৬০ কোটি টাকা পকেটে ঢোকানো; কিন্তু পদ খালি নেই। আবার সব প্রক্রিয়া অনলাইনে। তবে চক্রটি এতটাই প্রভাবশালী, সব বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চার মাসেই পৌঁেছ যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করে নির্বিঘ্নে শেষ করেছে প্রায় দুই হাজার বদলি। নেওয়া হয়েছে শিক্ষকপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা— অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পরপরই বন্ধ হয়েছে বদলি। কিন্তু ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে ‘বদলি-বাণিজ্য’। আর প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে এরই মধ্যে তদন্তে নেমেছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
এমন ঘটনা ঘটেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে বদলির ক্ষেত্রে। গত মার্চ থেকে জুন— এই চার মাসে অবৈধভাবে এসব বদলি করা হয়েছে। যার সিংহভাগই শূন্যপদের বিপরীতে নয়; বরং প্রেষণ বা সংযুক্তির মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরের নামি স্কুলগুলোতে পদায়ন করা হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছানোর পর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে এসব বদলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আগামীর সময়ের হাতে আসা শতাধিক বদলির আদেশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি আদেশও অনলাইনে দেওয়া হয়নি। অথচ বিধান অনুযায়ী, শিক্ষক বদলি অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি এসব আদেশ ওয়েবসাইটে দিতে হবে; কিন্তু সবকিছুই হয়েছে হাতে হাতে।
একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এসব বদলির খবর ১৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কানে পৌঁছানোর পরপরই শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে (যিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে) ডেকে পাঠান। দ্রুত এসব অনিয়ম বন্ধের নির্দেশ দেন। শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, এটি বন্ধ করতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক তদবির বন্ধ করতে হবে। এজন্য বদলি-সংক্রান্ত একটি কমিটি করার প্রস্তাব দেন। বদলিকে কেন্দ্রীয়ভাবে না রেখে চার স্তরের কমিটি গঠন করে বিকেন্দ্রীকরণ করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সে প্রস্তাবে সম্মতি দিলে গত ২১ জুন উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়— এই চার স্তরের কমিটি গঠন করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষক বদলি শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হোক। কিছু জটিলতা ছিল। সেগুলো দূর করতেই চার স্তরের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বদলি শিক্ষকদের একটি মৌলিক চাহিদা, আমরা চাই এটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে হোক। কারণ বিষয়টি উন্মুক্ত রাখলে নানা ধরনের তদবির আসে, তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নেয়।’
বদলির আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ বদলি হয়েছে গত মার্চ মাসে ৯৪৪টি। এরপর রয়েছে এপ্রিল ও মে। জুন মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত চলে এ বদলি-বাণিজ্য। গত ২৫ মার্চ দুটি আদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৌরভী খানমকে ঢাকার গুলশানের কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ভেড়ামারা বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুমা খাতুনকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের আশরাফাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এমন শতাধিক অর্ডারের সত্যতা মিলেছে। শুধু রাজধানীতেই নয়, এই বদলি-বাণিজ্যের জাল বিস্তৃত ছিল ঢাকার বাইরেও। যার প্রমাণ মেলে গত ৪ এপ্রিল কয়েকটি অাদেশে। যেখানে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় উপজেলা, আন্তঃজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বদলির আদেশ হয়েছে।
প্রশাসন শাখার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত এক দশক বদলির ক্ষেত্রে প্রতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ— এই তিন মাসই ছিল বদলির নির্ধারিত সময়। এই নিয়মের পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যাও ছিল, বছর জুড়ে হুটহাট বদলি হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে শিক্ষকশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। সে কারণেই শিক্ষাবর্ষের শুরুতে তিন মাসের মধ্যে বদলির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের বদলির দায়িত্বে থাকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বদলির অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। আমরা শুধু সে আদেশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য পাঠিয়ে থাকি। অনলাইনে আবেদন না নিয়ে কেন অফলাইনে বদলি করা হলো— সে ব্যাখ্যা মন্ত্রণালয় দিতে পারবে।’ তিন মাসে কতটি বদলি হয়েছে, সেটি তার জানা নেই— যোগ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক বদলিকে কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে শিক্ষা প্রশাসনে। কারা কতটি বদলির তদবির করেছে, এর সংখ্যা খোঁজা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কয়েকবার বদলির ফাইল অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও সেগুলো আটকে দেন শিক্ষামন্ত্রী।
বদলিকে কেন্দ্র করে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ গত চার মাসে সৃষ্টি হয়েছিল, কমিটির মাধ্যমে হলে তা অনেকটাই কমে আসবে—এমন প্রত্যাশা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেনের। তিনি অাগামীর সময়কে বললেন, যেসব বদলি হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী করা হয়েছে এবং প্রতিটি আদেশের রেফারেন্স সংরক্ষিত আছে।
এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রচলিত অনলাইন বদলি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বাইপাস করা হয়েছে। আর হাতে হাতে জারি করা এই আদেশগুলোই প্রমাণ করে শিক্ষক বদলিতে নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়ালে এক বিশাল সিন্ডিকেট কাজ করেছে। সরকার যখন বদলি প্রক্রিয়াকে ঘুষ, দালাল চক্র ও প্রভাবমুক্ত করতে অনলাইন ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করেছে, তখন এসব বদলির আদেশ জারি করা নির্দেশনা লঙ্ঘনই নয়, ডিজিটাল প্রশাসন ও সুশাসনের লক্ষ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজবাড়ী




