৫ হাজার ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দিয়েছেন তৌফিক

রক্তবালক মো. তৌফিক আহমদ
মধ্যরাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন মো. তৌফিক আহমদ (২৮)। হঠাৎ অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোন রিসিভ করতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে ‘রক্ত লাগবে’ আওয়াজ। রোগী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি। ঠিকানা নিয়েই আড্ডা ছেড়ে ছুটে যান হাসপাতালে। রাত ১টায় রক্ত দিয়ে বাসায় ফেরেন ৩টায়।
গত ১৩ জুন রাজধানীর ওই হাসপাতালে তিনি ৩১-বারের মতো রক্ত দিয়েছেন। এ ধরনের বহু গল্পের সাক্ষী তৌফিক। এ পর্যন্ত মানুষকে সংগ্রহ করে দিয়েছেন পাঁচ হাজার ব্যাগ রক্ত।
বন্ধুমহলে তিনি পরিচিত ‘রক্তবালক’ হিসেবে। তার এই কাজের শুরু ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায়। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন তৌফিক। বর্তমানে ঢাকা জজ আদালতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের এই যুবক।
তৌফিক বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার আগের রাতে কিছু সময়ের জন্য মোবাইল ফোনটি বন্ধ রেখেছিলাম। কিছুক্ষণ পর রাত ১১টার দিকে ফোন চালু করতেই একাধিক কল। রিসিভ করতেই ওপার থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠ। প্রয়োজন এবি-নেগেটিভ রক্ত। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে।’
‘পরীক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে রাত ২টা পর্যন্ত রক্ত সংগ্রহের চেষ্টা করলাম। অবশেষে মিলেছিল রক্ত। সে যাত্রায় সৃষ্টিকর্তার কৃপায় প্রাণে বেঁচেছিলেন একজন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোটা সময় কেটেছে রক্ত নিয়ে। এ কাজ করতে গিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, দোয়া ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে’ যোগ করেন তিনি।
তৌফিক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যখন ফোনে রোগীর শারীরিক অবস্থার কথা শুনি, তখনই রক্ত সংগ্রহে নেমে পড়ি। আর রোগী সুস্থ হলে আনন্দ পাই। ৯ বছরে একাই ৫ হাজার ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দিয়েছি, এখনো করে যাচ্ছি। যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিন এই কাজ করে যাব।’
তৌফিকের বন্ধু রুমি নেমানের কথা, ‘তৌফিক এমন ছেলে, যে অনেক সময় নিজের খাওয়ার টাকা দিয়ে অন্যের জন্য রক্ত সংগ্রহ ও রক্তের ব্যাগ কিনে দেয়। এ রকম অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী আমি। এমন একজন বন্ধুর জন্য আমরা গর্ববোধ করি। এমন কিছু মানুষের জন্য পৃথিবীটা আজও সুন্দর আছে।’
‘ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আমার অস্ত্রোপচারের সময় এ-পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। তৌফিক ভাই ফোন পেয়েই হাসপাতালে এসে রক্ত দেন। তার কল্যাণে বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পাই’— আগামীর সময়কে বলছিলেন বগুড়ার শাহজানপুর উপজেলার আয়েশা আক্তার (৩৫)।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তৌফিক জানালেন, ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান’— স্লোগান নিয়ে একটি ওয়েবসাইট চালুর ইচ্ছা আছে তার। যেখানে সারা দেশের রক্তদাতাদের নামের তালিকা থাকবে, যেখান থেকে দেশের সব জেলার মানুষ উপকৃত হবেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আরমিন খাতুনের ভাষ্য, নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে যারা অন্যের উপকার করেন, তাদের মধ্যে তৌফিক একজন— যে নিজের অর্থ ও পরিশ্রম দিয়ে মানবতার কাজ করে যাচ্ছে। নিজে রক্ত দিয়ে এবং রক্ত জোগাড় করে দিয়ে মানুষের কঠিন মুহূর্তে সে পাশে থাকছে।




