রাত বাড়তেই উত্তপ্ত দিল্লির যন্তর-মন্তর
- আবারও চলল কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ
- পুলিশের অতর্কিত আক্রমণ বহু ছাত্র আহত
- যন্তর-মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়

রাতেও কমেনি যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ভিড়। ছবি: সংগৃহীত
রাত যত গভীর হয়েছে, যন্তর-মন্তরের আকাশ ততই ভারী হয়েছে স্লোগানে, উদ্বেগ আর ক্ষোভে। দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার পরও হাজার হাজার ছাত্র-যুবক, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনস্থল ছেড়ে বাড়ি ফেরেননি। বরং সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও মানুষ যন্তর-মন্তরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। সেই বাড়তে থাকা জনস্রোতের মাঝেই বুধবার রাতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় সংসদ মার্গ ও যন্তর-মন্তর সংলগ্ন এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনস্থলের বাইরে মানুষের ভিড় দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেকেই ব্যারিকেডের বাইরে আটকে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ঢেকে যায় রাস্তার একাংশ। আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হলেও আন্দোলনকারীদের বড় অংশ সেখানেই অবস্থান ধরে রাখেন।
এই সময় আন্দোলনের সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালান। কেউ পুলিশের গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে লাউড স্পিকারে শান্তিপূর্ণ থাকার আবেদন জানান, কেউ আবার মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। উত্তেজনার মাঝেও আন্দোলন যাতে সহিংসতায় না গড়ায়, সেই বার্তাই বারবার শোনা যায় মঞ্চ ও স্বেচ্ছাসেবকদের পক্ষ থেকে।
দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের একাংশ পাথর ছোড়ে এবং সেই ঘটনায় এক এসিপিসহ ছয় পুলিশ আহত হন। পুলিশের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিপুল সংখ্যক শান্তিপূর্ণ ছাত্র-যুবকের সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করতে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং অতর্কিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে তাদের উপর। এরফলে বহু ছাত্র আহত হয়েছেন বলে রয়েছে অভিযোগ।
অন্যদিকে রাতের আরেকটি বড় বিতর্ক ছিল যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে। যন্তর-মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। বহু মানুষ লাইভ সম্প্রচার করতে পারেননি, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যায় পড়েন। বিরোধী নেতারাও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন— গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সীমিত করার প্রয়োজন কেন পড়ল?
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও আন্দোলনের ভিড় কমেনি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নতুন নতুন দল আন্দোলনস্থলের দিকে পৌঁছাতে থাকে। কেউ খাবার বিতরণ করেছেন, কেউ পানীয় জল, কেউ আবার চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে হাজির হয়েছেন। আন্দোলনস্থলের একদিকে যখন ধোঁয়া আর উত্তেজনা, অন্যদিকে তখন স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকরা ক্লান্ত ও অসুস্থ আন্দোলনকারীদের সেবা করে চলেছেন।
এই ছবিই হয়তো বর্তমান আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বার্তা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন মাত্র একটি পরীক্ষার গণ্ডিতে আটকে নেই। বহু তরুণ-তরুণীর কাছে এটি ভবিষ্যৎ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আর সেই কারণেই কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া সরে যাওয়ার পরও যন্তরমন্তরে মানুষের উপস্থিতি কমেনি।
দিনের ঘটনাপ্রবাহও কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। এদিন দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে অতিরিক্ত ২০ কোম্পানি সিআরপিএফ দিল্লিতে আনা হয়, সংসদে এই আন্দোলন নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয় এবং অনশনরত সোনম ওয়াংচুক ঘোষণা করেন— আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা পেলে তিনি অনশন ভাঙতে প্রস্তুত।




