তুলনা
ওফেলিয়া: মঞ্চনাটক, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্রে
- একই চরিত্র সৃজনশীলতার একেক মাধ্যমে একেকভাবে রূপান্তর হয়। ওফেলিয়া তার উদাহরণ

মেলানকলিয়া। চলচ্চিত্রকার: লার্স ফন ত্রিয়া
মঞ্চনাটকে
চরিত্রটির মূল স্রষ্টা ব্রিটিশ কিংবদন্তি নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র (২৩ এপ্রিল ১৫৬৪-২৩ এপ্রিল ১৬১৬)। তার বিখ্যাত মঞ্চনাটক ‘হ্যামলেট’-এ (১৫৯৯-১৬০১) ওফেলিয়া হলো ডেনমার্কের একজন অভিজাতবংশীয় নারী, খলনায়ক কিং ক্লাউদিয়াসের প্রধান পরামর্শক পালোনিয়াসের কন্যা, হ্যামলেটকে ছুরিকাঘাত করা লেয়ারটিজের বোন এবং রাজকুমার হ্যামলেটের সম্ভাব্য স্ত্রী। পরিবারের প্রতি অনুরাগ, হ্যামলেটের প্রতি ভালোবাসা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে নির্মমভাবে আটকা পড়ে সে ক্রমাগত কূটকৌশলের শিকার হয়। তাতে একপর্যায়ে উন্মাদ হয়ে যায় এবং অবশেষে পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে তার। এই সলিলসমাধি ঘটে নাটকটির চতুর্থ অঙ্কের সপ্তম দৃশ্যে; মঞ্চের বাইরে। রানী গার্ট্রুডের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ফুল তোলার সময় একটি স্রোতধারায় বা ছোট নদীতে পড়ে গিয়েছিল ওফেলিয়া। মুহূর্তটির চিত্রকল্পে রয়েছে, তার পোশাক ক্ষণিকের জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাকে জলপরীর মতো ভাসিয়ে রেখেছিল। তলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার কণ্ঠে ছিল গান।
চিত্রকলায়
মঞ্চনাটকের চরিত্র হলেও স্থিরচিত্রে ওফেলিয়ার নাম এলেই চোখে ভেসে ওঠে যে ছবি, সেটি উনিশ শতকের ব্রিটিশ প্রভাবশালী চিত্রশিল্পী জন এভারিট মিলেইর (৮ জুন ১৮২৯-১৩ আগস্ট ১৮৯৬) আঁকা। ‘ওফেলিয়া’ (১৮৫১-১৮৫২) চিত্রকর্মটিতে এই চরিত্রকে একটি সবুজ স্রোতে চিত হয়ে ভেসে থাকতে দেখা যায়। তার হাত দুটি ওপরের দিকে ওল্টানো, ঠিক ডুবে যাওয়ার আগের এক শান্ত মুহূর্তে সে যেন জমে গেছে। থোকা থোকা ফুটে থাকা ফুলগুলো প্রকৃত অর্থে উৎস নাটক থেকে বিভিন্ন অর্থ বহন করে। কেননা, পপি ফুল মৃত্যুর প্রতীক আর বেগুনি ফুল বিশ্বস্ততার প্রকাশ ঘটায়।
চলচ্চিত্রে
‘ডগমা ৯৫’ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অগ্রদূত এবং প্রখ্যাত ডেনিশ চলচ্চিত্রকার লার্স ফন ত্রিয়া (৩০ এপ্রিল ১৯৫৬-) মহাপ্রলয়ভিত্তিক কল্পবিজ্ঞান ধারার চলচ্চিত্র ‘মেলানকলিয়া’র (২০১১) একটি দৃশ্যে মিলেইর চিত্রকর্মের পুনর্সৃষ্টি করেছেন। চলচ্চিত্রটির শৈল্পিক, ধীরগতির সূচনাপর্ব এবং এর প্রচারণামূলক পোস্টারগুলোতে মূল চরিত্র জাস্টিনকে (কার্স্টেন ডানস্ট অভিনীত) বিয়ের সাদা পোশাক পরে নদীতে ভেসে যেতে দেখা যায়; ‘ওফেলিয়া’ চিত্রকর্মের অনেকটা হুবহু ভঙ্গিতে। তার হাতে ধরা থাকে ফুলের তোড়া। শেকসপিয়রের চরিত্রটি যেখানে দুঃখ ও উন্মাদনায় মারা গেছে, সেখানে ফন ত্রিয়া এই চিত্রকল্পকে তীব্র গুরুতর বিষণ্নতার একটি চরম রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ‘হ্যামলেট’-এ ওফেলিয়া হলো উন্মাদনার শিকার হওয়া এক নিষ্ক্রিয় চরিত্র; এর বিপরীতে ‘মেলানকলিয়া’র জাস্টিন বরং পৃথিবীর অনিবার্য ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সবচেয়ে স্পষ্টবাদী, শান্ত এবং বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এক দৃঢ় চরিত্রে রূপ নিয়েছে।





