নেইমার ব্রাজিলের আশীর্বাদ না অস্বস্তি

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নেইমারের থাকা না থাকা নিয়ে অনেক আলোচনা ছিল চারদিকে। একপক্ষ নেইমারহীন ব্রাজিলকে ভাবতেই পারছিল না। রোনালদো ফেনোমেননের মতো বড় তারকারাও ছিলেন এই দলে। অন্যদিকে কার্লো আনচেলত্তির মতো কেউ কেউ দাবি তুলেছিলেন চূড়ান্ত ফিটনেসের। একদিকে আবেগ আর আরেক দিকে রূঢ় বাস্তবতা।
শেষমেশ আবেগের জয় হয়েছে। নিরাবেগ মনোভাবে আনচেলত্তিও কঠোর থাকতে পারেননি। তবে বাস্তবতা হলো, ইনজুরিহীন নেইমার যেন অলীক কল্পনা। অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দিতে এসেই ধরা পড়ে তার ডান পায়ের পেশির চোট মোটেও সামান্য নয়। পায়ের কাফ মাসলে দ্বিতীয় গ্রেডের ইনজুরি, যা সারতে দুই-তিন সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। মিস করতে পারেন মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচও। আসলে কবে নাগাদ পুরো সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরবেন, সেটা অজানা।
এ নিয়ে নেইমারের সান্তোস ক্লাব ও জাতীয় দল একরকম মুখোমুিখ অবস্থানে। সান্তোসের ডাক্তার বলেছিলেন— সামান্য চোট, এক সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যাবে। কিন্তু নেইমার ক্যাম্পে ঢোকার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। তাই সন্দেহ ক্লাব কর্তৃপক্ষকে নিয়ে, তারা খেলোয়াড়ের চোটের ভয়াবহতা চেপে গিয়েছিল, যেন নেইমারকে জাতীয় দলে ডাকা হয়। সেটা যাই হোক, নেইমারের অন্তর্ভুক্তি জাতীয় দলের শক্তি বাড়ানোর চেয়ে বরং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে অন্য কেউ হলে ইনজুরি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাদ দেওয়া হতো দল থেকে। ডেকে নেওয়া হতো নতুন কাউকে। নেইমার সেই সাধারণের কাতারে পড়েন না বলেই হয়তো অপেক্ষা। ব্রাজিলের জার্সিতে সর্বোচ্চ ৭৯ গোল করা এ ফরোয়ার্ড দলে থাকলে অবশ্যই বিশাল পার্থক্য গড়ে দিতে পারবেন। তা ছাড়া এ বিশ্বকাপটা খেলতে তারও প্রবল আকুতি। কিন্তু ৩৪ বয়সী এ ফুটবলারের ক্যারিয়ারে এমন ইনজুরি-যোগ যে, কখন তাকে সুস্থ-সবল পাওয়া যাবে, সেটাই হয়ে গেছে বড় প্রশ্ন। ব্রাজিল দলের কোচিং স্টাফরা জানিয়েছেন, মরক্কোর সঙ্গে প্রথম ম্যাচের আগের দিন পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবেন। দেখবেন, টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো খেলার জন্য ফিট হন কি না।
চোট কাটিয়ে ফিরতে পারলে অবশ্যই সেলেসাওদের জন্য নেইমার হবেন ‘এক্স ফ্যাক্টর’। সাম্প্রতিককালে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এই দলে কোনো শিরোপার শোভা দেখছেন না ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। শুধু ভিনিসিয়ুস-রাফিনহার মতো ফরোয়ার্ড থাকলেই কি হয়? তারা আবার ক্লাবের মতো নিজেদের মেলে ধরতে পারেন না হলুদ জার্সিতে। তা ছাড়া রক্ষণ ও মধ্যমাঠে অনেক খুঁত। মার্সেলো বা রবার্তো কার্লোসের মতো কোনো উইং ব্যাকও নেই এই দলে। তাই চোটহীন নেইমারই হতে পারেন ব্রাজিলের ত্রাতা। তিনিই ছড়াতে পারেন শিরোপার রঙ।
দলে খুব দরকার এই তারকাকে। আবার তারও প্রবল আকুতি এই বিশ্বকাপ খেলতে। শনিবার বিশ্বকাপ যাত্রায় গ্রাঞ্জা কোমারি ছেড়ে যাওয়ার সময় খুবই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন নেইমার। সবসময় এখানেই হয় জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্প। শনিবার ক্যাম্পে মাঠে নেমে ভিনি-পাকেতাদের সঙ্গে তিনি হাস্যরসে মেতেছেন। অটোগ্রাফ দিয়েছেন ভক্তদের। খেলোয়াড়রা অাত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক এক করে মাঠ ছেড়ে গেছেন। নেইমার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আনমনে চেয়ে থাকেন। কী যেন ভাবলেন। শেষে তিনিও রিও ডি জেনিরোর পথে রওনা হলেন সতীর্থদের সঙ্গে।
রিওতে বিশ্বকাপের আগে দেশের মাঠে পানামার বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলতে নামবে ব্রাজিল। রবিবার মারাকানায় দর্শকরা শুভকামনা জানাবে হেক্সা মিশনের অভিযাত্রীদের। আশায় বুক বাঁধতে চাইবে। কিন্তু আশার পালে যিনি হাওয়া দিতে পারেন সেই নেইমারকে দেখা হবে না হলুদ জার্সিতে। তাই দর্শক মনে আক্ষেপ হতেই পারে—
‘নামে তুমি কাছের মানুষ, কাজে তো দূরদেশ,
এই ইনজুরির গল্পটি কি হবে না আর শেষ?’






