চরিত্র বদলাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবার অস্ট্রেলিয়া গেছে বাংলাদেশ দল ‘সম্মান’ নিয়ে ফেরার কথা বলে। অর্থাৎ লেজেগোবরে হারের অসম্মান যেন না হয়, এই ছিল মোটাদাগে লক্ষ্য। তাই ডারউইনে প্রথম দিনে হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিংটা ছিল অনেক বড় চমক। এই পেসার ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে থামিয়ে দেন ১৯৮ রানে।
এরপর শঙ্কাটা বেড়ে গিয়েছিল। এবার বোধহয় অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর বোলিংয়ের তোপে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে বাংলাদেশের ব্যাটিং।
না, সেটা হয়নি। এবার তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটিংয়ে সেই ভয় কাটিয়ে বাংলাদেশ গড়েছে ৪২৬ রানের বড় স্কোর।
নিশ্চয়ই দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ফিরবে তাদের চিরচেনা চেহারায়। বাংলাদেশের বোলারদের পক্ষে টানা দুই ইনিংসে দাপট দেখানো হয়তো সম্ভব হবে না।
এই শঙ্কাও উড়িয়ে দিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ (৫/৬৬), তার ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়া আটকে যায় ২৯৮ রানে। এরপর হাতছোঁয়া দূরত্বে চলে আসে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া জয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের চরিত্র বুঝে যতরকমের আশঙ্কা হয়েছিল, সবই উড়িয়ে দিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। একটা সেশনের ঝড়ে সব দাপট ধুয়েমুছে যাবে, স্টার্ক-কামিন্সদের ভয়ে ব্যাটাররা আত্মাহুতি দেবে—এমন সব পুরনো গল্পের পাতা একটানেই যেন ছিঁড়ে ফেলল বাংলাদেশ। মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে গুঁড়িয়ে হাসান-মেহেদীরা শুধুই একটা টেস্ট জেতেননি, একটা বড় দল হয়ে ওঠার চরিত্রও প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
এই জয়ের ভিত গড়েন হাসান মাহমুদ। তার ‘অস্ট্রেলীয় লেন্থে’র নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ধস নামে অজি ব্যাটিংয়ে। ৬ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের যে কঠিন ধাক্কা দিয়েছিলেন, তা ছিল তাদের অহমে এক মোক্ষম আঘাত। হতে পারে বাংলাদেশকে হালকাভাবে নিয়েছিল স্বাগতিকরা। আবার এটিও ঠিক, তাদের ডারউইনকে ভালোভাবে চিনেছেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। হাসান মাহমুদ ও তানিজদ তামিম ওখানকার আলো-হাওয়ায় খেলেছেন ‘এ’ দলের হয়ে।
হাসানের সেই আগুনে বোলিং যদি ভিত হয়, তামিমের সেঞ্চুরি (১০১) ওপরের নান্দনিক স্থাপত্য। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অহেতুক অস্থিরতা নেই— এক পরিণত ব্যাটারের মতোই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেছেন। সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংসটাও ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশকে ৪২৬ রানের পাহাড়ে তুলে নিতে। পাহাড় বলায় আপত্তি থাকতে পারে, তবে ২২৮ রানের লিড নিয়ে কী চাপেই না ফেলেছিল অজিদের।
সেই চাপ উতরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলে রুখে দাঁড়ান মিরাজ। তার ঘূর্ণি অস্ট্রেলীয় ব্যাটারদের মনে এমন গোলকধাঁধা তৈরি করেছিল, এখান থেকে আর বের হতে পারেনি অজিরা। ২৮৪ রানে ইনিংস গুটিয়ে গেলে বাংলাদেশ পায় এক ঐতিহাসিক জয়। যারা চার দিন খেলতে পারবে কি না, এ নিয়েই ছিল সংশয়, সেই তারাই চারটি দিন একছত্র আধিপত্য ধরে রেখে ডারউইনে গড়েছে নতুন ইতিহাস। ৯ উইকেটের জয় শুধুই একটি পরিসংখ্যান নয়, একটি স্টেটমেন্টও। লাল-সবুজের ক্রিকেট এখন আর রূপকথার গল্পের অপেক্ষায় থাকা ছোট দল নয়, বরং লাল বলের আঙিনায় তারা ধীরস্থির, পরিণত এবং নতুন শক্তি। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট যেন নতুন চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে।






