সাধকের শহরে ক্রিকেট সাধকের কীর্তি

মোহাম্মদ আব্বাসের বলটা মুশফিকের ব্যাটের ছোঁয়ায় যাচ্ছিল বাউন্ডারির সীমানার দিকে। তা বুঝেই ব্যাটসহ দুই হাত উঁচিয়ে ধরলেন। একবার হাত ঘুরিয়ে করলেন আনন্দের চিৎকার, যেন সেই প্রথম সেঞ্চুরির উচ্ছ্বাস। মুশফিক ব্যাট ফেলে দিলেন ক্রিজের মাঝখানে। জড়িয়ে ধরলেন অন্য প্রান্তে থাকা সতীর্থ তাইজুল ইসলামকে।
সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে মুশফিক সেজদা দিলেন মাটিতে। এরপর দুই হাত উঁচিয়ে ধরলেন আকাশে আর ব্যাট হাতে নিয়ে তুলে ধরলেন ওপরে। সতীর্থরা ড্রেসিংরুম থেকে দাঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন করতালি। সিলেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিও তখন মাতোয়ারা।
সুফি সাধকের শহর সিলেটে এক ক্রিকেট সাধকের রেকর্ড সেঞ্চুরির সাক্ষী হওয়াও তো গর্বের। শাহজালাল-শাহ পরানের পুণ্যভূমিতে মুমিনুল হকের ১৩তম সেঞ্চুরির রেকর্ড পেছনে ফেলে বাংলাদেশের হয়ে এখন এককভাবে সর্বোচ্চ ১৪ টেস্ট সেঞ্চুরির কীর্তি তার।
তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল সারা দিন ব্যাট করা। তা না হলেও মুশফিকের সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ দিন শেষের কিছুক্ষণ আগে অলআউট হয়েছে ৩৯০ রানে। জয়ের জন্য পাকিস্তানের দরকার ৪৩৭ রান। ক্রিকেট ইতিহাসেই সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ৪১৮। তাই সিলেট টেস্ট জিততে হলে ইতিহাস গড়তে হবে পাকিস্তানকে। সেই লক্ষ্যে দুই ওভারে কোনো রান না নিয়ে বিনা উইকেটে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করেছে পাকিস্তান। খুররম শাহজাদ ৪ ও সাজিদ খান নেন ৩ উইকেট। সিলেটে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ১০ উইকেট আর পাকিস্তানের ৪৩৭ রান।
মুশফিক সবসময়ই ক্রিকেট সাধক। অনুশীলনে আসেন সবার আগে। সবাই যখন বিশ্রামে, তখনো ঐচ্ছিক অনুশীলন চলে তার। গতকাল চা বিরতিতে যাওয়ার সময় অপরাজিত ছিলেন ৯০ রানে। চা বিরতির ১৫ মিনিট দীর্ঘ মনে হচ্ছিল মুশফিকের। ছটফট করছিলেন ক্রিজে নামতে। পরের ১০ রান ২৩ বলে করে পৌঁছলেন বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সেঞ্চুরির চূড়ায়।
এই সেঞ্চুরির মাহাত্ম্য আছে আরও। বাংলাদেশ দ্বিতীয় দিন শেষ করেছিল ৩ উইকেটে ১০৩ রানে। ১৩ রানে অপরাজিত থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত গতকাল আর দুই রান যোগ করে খুররম শাহজাদের বলে এলবিডব্লিউ হলে পথও হারাতে পারত বাংলাদেশ। লিটন দাসকে নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তা হতে দেননি মুশফিক।
পঞ্চম উইকেটে লিটন দাসের সঙ্গে মুশফিকুর রহিম গড়েন ১২৩ রানের জুটি। তাতেই লাগামটা চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। একটা সময় মনে হচ্ছিল অনায়াসে সেঞ্চুরি করতে যাচ্ছেন লিটন। কিন্তু হাসান আলির শর্ট বলে ছক্কা মারতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে সৌদ শাকিলের তালুবন্দি হয়ে ফেরেন লিটন। ৫৫ রানে থাকতে সাজিদ খানের ক্যাচ মিসে জীবন পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি লিটন। একই টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরির কীর্তিটা হয়নি তাই। তবে প্রথম বাংলাদেশি উইকেটরক্ষক হিসেবে তিন টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি ও ফিফটির রেকর্ড গড়েন লিটন।
৭৩তম ওভারের তৃতীয় বলে ডাবলস নিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ হাজার রানের মাইলফলকে পা রাখেন মুশফিক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ১৯২ রান তামিম ইকবালের। তখন মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে জুটি গড়ার চেষ্টা করছিলেন মুশফিক।
শুরুটা ভালো করলেও মিরাজ ১৯ করে বোল্ড হন খুররম শাহজাদের বলে। এরপর তাইজুল ইসলামের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশের লিড ৪০০-এর বেশি নিয়ে যান মুশফিক। চা বিরতির আগে মুশফিকের মনোযোগ টলিয়ে দিতে তার সঙ্গে হুট করেই তর্কে জড়ান পাকিস্তানি অধিনায়ক শান মাসুদ। কিছু একটা নিয়ে অভিযোগ জানান আম্পায়ারকেও। অভিজ্ঞ মুশফিক জানতেন, এটি মনোযোগে চিড় ধরানোর কৌশল। তাই পাত্তাই দেননি মাসুদকে। তাকে পাল্টা কিছু বলে উল্টো এগিয়ে গিয়ে হাত মেলান তাইজুলের সঙ্গে।
চা বিরতির পর ফিরে ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি করেন মুশফিক। এটি আবার টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ যুগে সবচেয়ে বেশি বয়সে সেঞ্চুরির রেকর্ড। ৩৯ বছর ৯ দিনে কীর্তিটা করলেন বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অস্ট্রেলিয়ান ভক্ত লিখেছিলেন, ‘মুশফিক ক্রিকেট খেলছেন মিচেল জনসন, মাইকেল হাসি আর শেন ওয়াটসনের অভিষেকের আগে থেকে। ওরা অবসর নিয়ে ফেললেও খেলে চলেছেন মুশফিক!’
শুধু খেলছেনই না, প্রতিনিয়ত প্রমাণও করে চলেছেন শততম টেস্টে (আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে) মাত্র ১১তম ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরি করা মুশফিক। ২০২২ সালের পর অন্তত ২৫ টেস্ট খেলেছেন— এমন ব্যাটারদের মধ্যে মুশফিকের গড় চতুর্থ সর্বোচ্চ ৪৬ দশমিক ৫১। এই সময়ে সর্বোচ্চ ৫৪ দশমিক ৯৭ গড় শ্রীলঙ্কার দিনেশ চান্দিমালের।
মুশফিকের প্রথম ৭ টেস্ট সেঞ্চুরি বয়স ৩০ বছর হওয়ার আগে। এজন্য খেলেছিলেন ১৪৮ ইনিংস। বয়স ৩০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আরও সফল মুশফিক। এরপর মাত্র ৪০ ইনিংসে করেছেন ৭ সেঞ্চুরি। বুড়িয়ে গেলেও ফুরিয়ে না গিয়ে পরিণতই হয়েছেন তিনি।
পাকিস্তানকে তো প্রিয় প্রতিপক্ষই বানিয়ে ফেলেছেন মুশফিক। ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানের বিপক্ষে চার টেস্টে মুশফিক ৪৬৯ রান করেছেন ৭৮ দশমিক ১০ গড়ে। সেখানে এই সময়ে অন্য দলের বিপক্ষে ১০ টেস্টে তার গড় ৩৬ দশমিক ৩০। মানে, পাকিস্তানিদের বিপক্ষে দ্বিগুণের বেশি গড় তার!
দ্বিতীয় ইনিংসে শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হন মুশফিক। ২৩৩ বলে ১২ বাউন্ডারি, এক ছক্কায় ১৩৭ করে সাজিদ খানের বলে ক্যাচ দেন মোহাম্মদ আব্বাসকে। তাইজুল ইসলাম (২২ রান), তাসকিন আহমেদ (৬), শরিফুল ইসলাম (১২), নাহিদ রানাদের (০*) সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্কোরটা ৩৯০-এ পৌঁছে দেন ক্রিকেট সাধক মুশফিকই।




