’৭১-এর দায় ও ইতিহাস পুনর্লিখন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইতিহাসের এক আশ্চর্য ও ক্রূর স্বভাব এই যে, সে কোনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না; বরং অলক্ষ্যে জমতে থাকা অমীমাংসিত প্রশ্নেরা একসময় হিমশৈলের মতো ভেসে ওঠে সমকালের স্রোতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া টানাপড়েন সেই সত্যেরই পুনরাবৃত্তি। আগামীর সময়ে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পাঠ্যপুস্তক ও আইনি সংজ্ঞা থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দলের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) তীব্র আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ ভিন্ন রূপ নেয়। ঘটনাটির গভীরে লুকিয়ে আছে একটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, ইতিহাস-দর্শনের সংকট এবং ক্ষমতার নৈতিকতার মৌলিক কিছু প্রশ্ন।
প্রশ্নটি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ও বৈধতার। একটি অন্তর্বর্তীকালীন ও বিশেষায়িত সরকার— যার মূল ম্যান্ডেট রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত সংস্কার ও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করা— ইতিহাসের মতো সংবেদনশীল ও মৌলিক বিষয়ে সে কি সিদ্ধান্ত নিতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি মহাকাব্যিক ও একই সঙ্গে ট্র্যাজিক ঘটনার সংজ্ঞায়ন হুট করে বদলে দেওয়া যায় না। বিষয়টি ঐতিহাসিক। এক বা দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহে ইতিহাস ঐতিহাসিক প্রপঞ্চে পৌঁছায় না। একাত্তরে প্রশ্নাতীতভাবে দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত দলগুলোকে ক্ষমা করা এক বিষয় আর দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা যেকোনো বিবেচনাতেই প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিহাস পুনর্লিখন প্রচেষ্টার এই দায় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে তাড়া করে ফিরবে।
কিন্তু এর সমান্তরালে যে সত্যটি আরও বেশি বেদনাদায়ক, তা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই জনপদে ইতিহাসের এক চরম অমীমাংসিত বন্ধ্যত্ব বিরাজ করছে। একদিকে, জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি, অন্যদিকে ক্ষমা চাইবার পরিবেশও তৈরি করা যায়নি। কারণ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের জামায়াত কর্মীর রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটিও কোনো অংশে কম নয়। অধিকন্তু, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সরকারই এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তি না বানিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এই দ্বিমুখী আচরণের ফল স্থায়ী বিভাজনের রাজনীতি। একাত্তরের চেতনা যেখানে প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হওয়ার কথা, সেখানে একে করা হয়েছে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির অস্ত্র। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলই— তা সে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি হোক— নিজেদের অতীত কৃতকর্ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেনি। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে ক্ষোভ আর অবিশ্বাসের চোরাবালি বারবার গণতান্ত্রিক বিকাশকে গ্রাস করছে।
ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকা শিখিয়েছে কীভাবে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন)-এর মাধ্যমে ক্ষত নিরাময় সম্ভব। অতীতকে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে কোনো জাতি দীর্ঘ মেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আজ সেই জাতীয় পুনর্মিলনের ঐতিহাসিক প্রয়োজন স্পষ্ট। যেখানে অপরাধী অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে আর সমাজ সেই ক্ষমার গভীরতাকে ধারণ করে বিভাজনকে সহনশীল মাত্রায় নামিয়ে আনবে।
যতক্ষণ না এই দার্শনিক আত্মশুদ্ধি ঘটছে, ততক্ষণ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস কেটেছেঁটে পুনর্লিখনের ক্ষতিকর খেলা চলতেই থাকবে; আর বাংলাদেশ আটকে থাকবে তার নিজেরই অতীতের গোলকধাঁধায়।




