কোটি টাকা হাতিয়ে অবসর চান প্রধান সহকারী
- খুলনা সিটি করপোরেশন

খুলনা সিটি করপোরেশন ভবন। ছবি: সংগৃহীত
খুলনা সিটি করপোরেশনে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পদে স্থায়ী চাকরির প্রলোভন দেওয়া হয় জয়ন্ত মণ্ডল নামে এক চাকরিপ্রত্যাশীকে। সেই প্রলোভনে পড়ে তার মা অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ভারতী মণ্ডল পেনশনের ১৮ লাখ টাকা করপোরেশনের প্রশাসনিক শাখার প্রধান সহকারী মো. নাঈমুজ্জামানের কাছে তুলে দেন। কিন্তু তার ছেলের চাকরি হয়নি, ফেরত পাচ্ছেন না টাকাও। অবশেষে টাকা ফেরত পেতে আদালতে মামলা করেন এবং সিটি করপোরেশনে অভিযোগ দাখিল করেছেন ভারতী মণ্ডল। শুধুই ভারতী মণ্ডলের ছেলে জয়ন্ত মণ্ডল নয়, অভিযোগ উঠেছে করপোরেশনে স্থায়ী ও অস্থায়ী পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে প্রতারণার মাধ্যমে ৭০ হাজার থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত করে ১০ থেকে ১২ চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মো. নাঈমুজ্জামান। তার খপ্পরে পড়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গেছে। তবে এ ঘটনা থেকে নিজেকে আড়াল করতে করপোরেশনে গত জুন মাসে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন নাঈম। আবেদনে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটিসহ সব আর্থিক সুবিধাও চেয়েছেন তিনি।
করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর ২৫টি শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সিটি করপোরেশন। এরপর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির মাধ্যমে ১৭টি শূন্য পদ পূরণে আবেদন আহ্বান করা হয়। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর করপোরেশনে বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে শর্তসাপেক্ষে ৩০০ শ্রমিক নিয়োজিত করতে প্রশাসনিক অনুমোদন মেলে। এরপর ওই চাহিদার আলোকে বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, করপোরেশনের প্রকাশিত জনবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে পুঁজি করে নাঈমুজ্জামান ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ শুরু করেন। চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রলোভনে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু তারা চাকরিও পাননি, টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না।
নাঈমের প্রতারণার শিকার হয়ে সম্প্রতি আদালতে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী ভারতী মণ্ডল। এ ছাড়া আরও চারজন ভুক্তভোগী সিটি করপোরেশনে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগকারীরা হচ্ছেন— মো. খোরশেদ আলম, ভারতী মণ্ডল, মো. শাহাদাৎ হোসেন ও মো. সিরাজুল ইসলাম।
চাকরিপ্রত্যাশী মো. শাহাদাৎ হোসেন জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনে উচ্চমান সহকারী পদে চাকরির প্রলোভন দেওয়া হয় তাকে। প্রলোভনে পড়ে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে নাঈমকে ১৭ লাখ টাকা দেন। টাকা নেওয়ার সময় প্রমাণ হিসেবে নাঈম তাকে জনতা ব্যাংক এবং ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে নিজের অ্যাকাউন্টের দুই দফায় ৫ লাখ ও ১২ লাখ টাকার চেক দেন। পরে চাকরি হয়নি, নাঈম টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। চেক দুটি ব্যাংকে জমা দিলে ডিজঅনার হয়েছে। ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমার ছোট ভাইকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে ৪ লাখ টাকা নেন নাঈম। পরে চাকরি দিতে পারেননি। টাকা ফেরত পেতে বহুবার তাগাদা দিয়েও কাজ হয়নি। তিনি এখন অফিসে আসাই বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়ে করপোরেশনে অভিযোগ দিয়েছি।’
করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের সিএ (গোপনীয় সহকারী) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তার এক আত্মীয়কে চাকরি দেবেন— এমন আশ্বাসে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নিয়েছিলেন নাঈম। পরে চাকরি দিতে পারেননি। তার কাছে অনেকবার তাগাদা দিয়ে কৌশলে টাকাগুলো ফেরত পেয়েছি। এ ব্যাপারে গতকাল সন্ধ্যায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক শাখার প্রধান সহকারী মো. নাঈমুজ্জামানের মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি ধরেননি।
প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস। তবে সংস্থাটির সচিব মো. রেজা রশীদ জানিয়েছেন, গত জুন মাসে নাঈম স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটিসহ সব আর্থিক সুবিধা চেয়েছেন। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টির তদন্ত হয়েছে। তদন্তে মো. নাঈমের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তার বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।




