কীটনাশক নয় ডেঙ্গু ঠেকাবে ব্যাকটেরিয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এম ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালের বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীর স্বজনের চোখের জল যারা দেখেছেন, তারা জানেন এই যুদ্ধ কতটা নির্মম। বছরের পর বছর ডেঙ্গুর সঙ্গে আমাদের লড়াই চলছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই তার তাণ্ডব শুরু হয়। আমরা হাসপাতালের রিপোর্ট দেখি। মৃতের সংখ্যা গুনি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ছয় হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা মূল যুদ্ধে হেরে যাচ্ছি।
২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে মারা যান ২৭৮ জন। অথচ গত ৯ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে উড়িয়েছে প্রায় ৭০৭ কোটি টাকা। এত টাকা খরচের পরও কেন প্রতিবছর ডেঙ্গুর মরণকামড় ফিরে আসে? উত্তর সহজ– আমরা পুরনো জং ধরা পদ্ধতিতে আটকে আছি। যদি এই সেকেলে কাঠামোকে আমরা আমূল বদলাতে না পারি, আগামী বছরও একই ট্র্যাজেডি দেখতে হবে।
এখন প্রয়োজন একটি ‘বায়ো-সোশ্যাল’ রূপান্তর। জীববিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নগর পরিকল্পনা, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি— এই পাঁচটি স্তম্ভকে একীভূত করে একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমরা এতদিন ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীটনাশক ও ফগিংয়ের মতো রাসায়নিক অস্ত্রের ওপর নির্ভর করেছি। এডিস মশা এখন এসব রাসায়নিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই প্রকৃতির কাছেই সমাধান খুঁজতে হবে। ‘উলবাকিয়া’ একধরনের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া এডিস মশার শরীরে প্রবেশ করালে তা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করে। এটি মানুষ বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘উলবাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে সাফল্য এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে ২০১১ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ‘উলবাকিয়া’ সংক্রমিত মশা ছাড়া হয়। এতে কুইন্সল্যান্ড ডেঙ্গুমুক্ত হয়ে যায়। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলে এই পদ্ধতি ডেঙ্গু সংক্রমণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমিয়েছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রামের সঙ্গে সরকার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে এডিস মশার মধ্যে উলবাকিয়ার সংক্রমণ ঘটিয়েছেন। ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো ঢাকায় এই পদ্ধতি সম্প্রসারণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা দরকার।
গত কয়েক বছরে হাজারো মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে, আমাদের ব্যবস্থাগত পরিবর্তন প্রয়োজন
বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অধিকাংশ উদ্যোগই সরকারি। এ ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫ থেকে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে একটি
‘ডেঙ্গু ডিটেক’ দল গঠন করা যেতে পারে। কীভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে হয় এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আপলোড করতে হয়— সে বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য ছোট আর্থিক প্রণোদনা িদতে পারে সরকার। তারা সিটি করপোরেশনকে রিয়েল টাইম ডেটা সরবরাহ করবে। এতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের লড়াইকে সামাজিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। সংক্রমণ এখন আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। কিন্তু আমাদের নগর পরিকল্পনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের কোনো আলোচনা নেই। ডেঙ্গু এখন গ্রামে-গঞ্জেও ছড়াচ্ছে। তাই নতুন কোনো আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার আগে ‘ডেঙ্গু-প্রুফ’ সার্টিফিকেটের বিষয়েও সরকার ভাবতে পারে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছে, এটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ মানে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন। পুরনো পদ্ধতিগুলো জরুরি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। গত কয়েক বছরে হাজারো মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে, আমাদের ব্যবস্থাগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি বিশেষায়িত সমন্বিত ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট বিভাগ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৬ সাল হোক ডেঙ্গু প্রতিরোধের ‘বায়ো-সোশ্যাল’ রূপান্তরের বছর। এই রূপান্তর সম্ভব হলে আমরা ডেঙ্গুকে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, নির্মূল করার পথে এগিয়ে যেতে পারব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা




