মা থাকলে প্রতিশোধের কথা বলতেন না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির নয়; বরং জুলাইয়ের অর্জন সবার উল্লেখ করে ঐক্যের ওপর দিয়েছেন জোর। প্রধানমন্ত্রী বললেন, তার দৃঢ় বিশ্বাস, মা (বেগম খালেদা জিয়া) এবং ভাই জীবিত থাকলে তারা প্রতিশোধের পথে না গিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিতেন। গতকাল শনিবার জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শান্তির এমনই বার্তা দেন তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেদের আর্তির কথা তুলে ধরেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজন ও জুলাই যোদ্ধারা। বুকে পাথরচাপা কষ্ট আর চোখে জল নিয়ে আবারও এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিচার চাইলেন তারা।
স্বজনদের দাবি, জুলাই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিলুপ্তি সম্ভব নয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নিজের প্রয়াত মা ও ছোট ভাইয়ের প্রসঙ্গ টানেন। সরকারপ্রধান বললেন, ‘এই মুহূর্তে যদি মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম— মা, গত ১৭ বছর আপনার ওপর যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন হয়েছে, আপনার সাথে যে অবিচার-অন্যায় হয়েছে— আপনি কি চান, আমি তার প্রতিশোধ নিই? কারণ, সেই প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন আমাকে দিয়েছেন। আমি নিশ্চিত— আমার মা আমাকে বলতেন, তোমার দায়িত্ব দেশের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া, দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একই প্রশ্ন করলে, আমার প্রয়াত ছোট ভাইও একই কথা বলত।’
জুলাই বিপ্লবের অর্জন কারও একার নয় উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি— এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; বরং এই অর্জন দল-মতনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের। আপনাদের ডানদিকে একটি ব্যানারে লেখা আছে— জুলাইয়ের শহীদ হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ফুলগুলোর নাম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ শিশু শহীদ হয়েছিল। তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে গিয়ে যেভাবেই হোক এ শিশুগুলো জীবন দিয়েছে।’
সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলছিলেন, ‘এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করে গেছেন, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছে। কিন্তু আমার হিসাবমতে, শুধু জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন ২ হাজারের মতো মানুষ, ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সার্বিকভাবে।’
‘আমি জানি, এখানে অনেক মা উপস্থিত আছেন। তারা দেখেছেন কীভাবে সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখানে অনেক ভাই উপস্থিত আছেন, তিনি দেখেছেন কীভাবে তার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আপনাদের এই কষ্টের বিপরীতে শুধু একটি কথাই আমি বলতে চাই— আপনাদের যে কষ্ট, সেই কষ্টটি আমিও বুঝি, অনুভব করতে পারি। জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, শহীদ হয়েছেন— সেটার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ছিল এদেশ, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, উন্নয়ন’— যোগ করেন সরকারপ্রধান।
এ সময় আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনজনকে যে আপনারা হারিয়েছেন তারও তো লক্ষ্য ছিল এদেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। আজ আমাদের হাতে সে সুযোগটি এসেছে। আমরা চাই না, জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে সামনে এগিয়ে যেতে। কারণ, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে কখনো সামনে নেওয়া যায় না। দেশকে সামনে একমাত্র তখনই নেওয়া সম্ভব, যদি আমরা সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি।’
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে হয় এই অনুষ্ঠান। এই সম্মেলনের মূলমন্ত্র ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবের ওপর প্রদর্শন করা হয় প্রামাণ্যচিত্র। এর আগে জুলাই বিপ্লবে শহীদ সন্তানদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেইন, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম এবং শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া। এ ছাড়া জুলাই বিপ্লবে আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল আমীন, মেহেদী হাসান মিরাজ তাদের যন্ত্রণা ও আকুতি তুলে ধরেন। এ সময় সন্তান ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো হলরুম।
স্বজনদের হাতে ‘স্মৃতিস্মারক’ তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী: অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই বিপ্লবে আহত আল মিরাজ এবং আমিনুল ইসলাম ইমনের হাতে ‘জুলাই স্মৃতিস্মারক’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শহীদ অন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে স্মৃতিস্মারক পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতেও তুলে দেওয়া হয় স্মৃতিস্মারক।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হোরায়রা, কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী, আয়োজক সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটির সভাপতি গোলাম রহমান, সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল প্রমুখ বক্তব্য দেন। এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।




