সুজনকে স্টিভ ওয়াহ বলেন ‘পাগলের প্রলাপে কান দিও না’

২০০৩ সালের ১৮ জুলাই ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে অজি কিংবদন্তি স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে টস করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন।
আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগের কথা। টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় পা রাখার তিন বছর পর ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে লাল বলের সিরিজ খেলতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তখনকার সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া। ডারউইন এবং কেয়ার্নসে অনুষ্ঠিত সেই সিরিজে স্টিভ ওয়াহ, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেইডেন, ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি আর গ্লেন ম্যাকগ্রাথদের সামনে পাত্তাই পায়নি খালেদ মাহমুদ সুজনের দল। দুটি ম্যাচই হেরেছিল ইনিংস ব্যবধানে। প্রায় দুই যুগ পর আবারও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গেছে বাংলাদেশ। তাই ফিরে ফিরে আসছে এত বছর আগের সেই স্মৃতি।
আগ্রাসী অধিনায়ক হিসেবে স্টিভ ওয়াহর সুনাম এবং দুর্নাম দুটোই ছিল। কিন্তু তখনকার নবীন টেস্ট খেলুড়ে বাংলাদেশের প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। ফক্স স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই পুরনো দিনের গল্প। বাংলাদেশের বর্তমান দলটি তাদের শেষ দুই সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে, ২০২৪ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপে সিরিজ ড্র করেছে এবং ২০২২ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জিতেছিল। কিন্তু ২৩ বছর আগের সেই সফরে খালেদ মাহমুদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দলটিকে আক্ষরিক অর্থেই বাঘের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল! অধিনায়ক নিজেই মাত্র পাঁচ টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন।
অনভিজ্ঞ এই দলটিকে রীতিমতো অপমান করে ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন প্রয়াত সাবেক অজি ক্রিকেটার ডেভিড হুকস। ‘নাও ফর এ ওয়ানডে টেস্ট’ শিরোনামের সেই কলামে তিনি লিখেছিলেন, ‘স্টিভ ওয়াহর উচিত বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে লাঞ্চের আগেই অলআউট করে দেওয়া। এরপর চা বিরতি পর্যন্ত ব্যাট করে ইনিংস ঘোষণা করতে হবে। শেষ সেশনে বাংলাদেশকে আবার ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে দিনের খেলা শেষ হওয়ার আগেই অলআউট করে দিতে হবে। এই টেস্ট একদিনের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব। কারণ, বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের যোগ্য নয়। মাঠে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। অস্ট্রেলিয়ান দল যদি ব্যাগি গ্রিনকে মর্যাদা দেয়, তবে তাদের উচিত মাঠে নেমে বাংলাদেশকে স্রেফ গুঁড়িয়ে দেওয়া।’
হুকসের এই মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মন খারাপ হয়েছিল। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার সেই সর্বজয়ী দলের অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহও এমন মন্তব্য ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। ম্যাচ শুরুর আগের দিন সন্ধ্যায় এক চায়ের আড্ডায় বাংলাদেশ অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনকে ডেকে এই বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন তিনি। স্মৃতিচারণ করে খালেদ মাহমুদ ‘ক্রিকবাজ’কে বলেন, ‘টেস্ট সিরিজ শুরু হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় দলের সবাই মিলে চা খাচ্ছিলাম। তখন হুট করেই স্টিভ ওয়াহ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “তুমি কেমন আছ?”।’
বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক আরও বলেন, “পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি এখানকার খবরের কাগজ পড়ো?’ আমি বললাম, ‘সাধারণত পড়ি না, তবে কখনো কখনো পড়ি।’ তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডেভিড হুকসের মন্তব্যটি কি তোমরা পড়েছ?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’ তিনি আমাদের বললেন, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। ওটা একটা পাগলের প্রলাপ। আমি বিশ্বাস করি তোমরা এর চেয়ে অনেক ভালো দল এবং আমাদের বিপক্ষে তোমরা ভালো খেলবে। তোমাদের জন্য শুভকামনা রইল।’”
মাঠের লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়া তাদের পেশাদারিত্বে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি। সেই ভয়ংকর অস্ট্রেলিয়ার সামনে বাংলাদেশ স্রেফ উড়ে গিয়েছিল। প্রথম টেস্টে মাত্র তিন দিনেই ইনিংস এবং ১৩২ রানে হারতে হয়েছে। দ্বিতীয় টেস্টটি চতুর্থ দিনে গড়িয়েছিল বটে, কিন্তু ইনিংস এবং ৯৮ রানের হার এড়ানো যায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অজিরা শতভাগ পেশাদারিত্ব দিয়ে পারফর্ম করলেও বাংলাদেশকে স্লেজিং করেননি। খালেদ মাহমুদের ভাষায়, ‘আমরা শুনেছি, অজিরা খুব স্লেজিং করে। কিন্তু মাঠে তার ছিটেফোঁটাও দেখিনি। তবে আমাদের মতো দুর্বল ও অনভিজ্ঞ দলের বিপক্ষেও তাদের অ্যাপ্রোচ ছিল শতভাগ পেশাদার। তারা কোনো বাজে বা আলগা বল করেনি। ফুল টস, হাফ ভলি, ওভার পিচ বা শর্ট অব লেন্থ—কিছুই ছিল না। তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী বুদ্ধি খাটিয়ে বোলিং করেছে।’
সেই সিরিজের স্মৃতিচারণ করে তৎকালীন অজি উইকেটকিপার কিংবদন্তি অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ‘ফক্স স্পোর্টস’কে বলেন, ‘আমি ডারউইনের প্রথম টেস্টে ব্যাট করেছিলাম। তবে কেয়ার্নসের দ্বিতীয় ম্যাচটিতে করিনি। আবহাওয়া ও কন্ডিশন বেশ আলাদা এবং সতেজ ছিল। ছেলেরা বেশ ভালোই ব্যাটিং করেছিল। ডারউইন সবসময়ই খুবই খোলামেলা সুন্দর শহর। তাই সবাই মিলে দারুণভাবে টেস্ট জয় উদযাপন করেছিলাম। পরিবেশটা সত্যিই খুব সুন্দর এবং উপভোগ্য ছিল।’
সেই দুই টেস্টে ১১ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার জেসন গিলেস্পি বলেন, ‘ডারউইনের স্মৃতিগুলো আমার কাছে সবসময়ই খুব মধুর। বাংলাদেশের বিপক্ষে এবং পরের বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলার দারুণ সব স্মৃতি রয়েছে। দর্শকরাও মাঠে দারুণ উৎসাহ নিয়ে খেলা উপভোগ করেছিলেন।’
পুরো সিরিজে ১৭ উইকেট নিয়ে সিরিজসেরা হয়েছিলেন লেগ স্পিনার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল, যিনি পরে কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নের ছায়ায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক টেস্ট জয়ের রেকর্ডে ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন স্টিভ ওয়াহ। সেটি ছিল তার নেতৃত্বে ৩৭তম টেস্ট জয়। ব্যাট হাতে স্টিভ প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ১০০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে অপরাজিত ১৫৬ রানের ইনিংস খেলেন। এর মাধ্যমে তিনি সেই সময় টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত সব দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও গড়েন।
২৩ বছর পর বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে। বর্তমান দলটিতে আছে বিখ্যাত পঞ্চপাণ্ডবের একজন মুশফিকুর রহিম, যিনি প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গেছেন। এই সিরিজে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারতেন গতি তারকা নাহিদ রানা। কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চোটে পড়ে তিনি লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে গেছেন। বাংলাদেশ সিরিজ উপলক্ষে পূর্ণশক্তির দল ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া। দলে আছেন প্যাট কামিন্স-জস হ্যাজেলউড-মিচেল স্টার্কের মতো ভয়ংকর পেসত্রয়ী। আছেন নাথান লায়নের মতো ঘূর্ণি জাদুকর। এ যাত্রাতেও একটি টেস্ট হবে ডারউইনে, অন্যটি ম্যাকাইয়ে। নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাসরা কীভাবে অজিদের সামলান, সেটিই এখন দেখার।








