হাদিসের কথা
মজার ছলেও কাউকে ভয় দেখানো বৈধ নয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। যে মানুষ ভয়মুক্ত পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে, তার চিন্তা, কর্ম ও ইবাদত সবই স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। এ কারণেই ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পাশাপাশি তার মানসিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এমনকি রসিকতার ছলেও কাউকে ভয় দেখানো বা আতঙ্কিত করা বৈধ নয়।
আব্দুর রহমান ইবনে আবু লায়লা (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিগণ এক সফরে ছিলেন। তাদের একজন ঘুমিয়ে পড়লে আরেকজন মজার ছলে তার সঙ্গে থাকা রশিটি সরিয়ে রাখেন। ঘুম ভাঙার পর তিনি নিজের জিনিস না পেয়ে ভীত হয়ে পড়েন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, "কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।" (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০০৪)
ঘটনাটি ছোট হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। এখানে চুরি হয়নি, মারধর হয়নি, অপমানও করা হয়নি। কেবল মুহূর্তের জন্য একজন মানুষ ভয় পেয়েছিলেন। অথচ সেই সামান্য আতঙ্ককেও রাসুলুল্লাহ (সা.) গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম মানুষের হৃদয়ের শান্তি ও মানসিক নিরাপত্তাকে কতটা মূল্য দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা কোনো অপরাধ ছাড়াই মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫৮) এই কষ্ট শারীরিক হতে পারে, আবার মানসিকও হতে পারে। ভয় সৃষ্টি, হুমকি দেওয়া কিংবা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াও মানুষের মনে কষ্টের জন্ম দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০) ইসলামের এই নিরাপত্তার ধারণা কেবল শারীরিক আঘাত থেকে মুক্ত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের বাক্য, আচরণ, ইঙ্গিত কিংবা রসিকতাও যেন অন্যের মনে ভয় বা অস্বস্তি সৃষ্টি না করে, সে দিকেও ইসলাম সমান গুরুত্ব দিয়েছে।
বর্তমান সমাজে এই হাদিসের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ, ভুয়া দুর্ঘটনার খবর, বোমা বা হামলার গুজব, ফোনে হুমকি, প্র্যাঙ্ক ভিডিও তৈরির নামে মানুষকে আতঙ্কিত করা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে এমন রসিকতা করা যাতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনেক সময় একটি ‘মজা’ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, মানসিক আঘাত কিংবা সামাজিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিভাবক শাসনের জন্য বলেন, ‘পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে’, ‘ভূত এসে নিয়ে যাবে’ কিংবা ‘ডাক্তার ইনজেকশন দেবে’। অথচ ভয়কে শিক্ষার মাধ্যম বানানো শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাত আমাদের শেখায়, তিনি শিশুদের সঙ্গে কোমলতা, স্নেহ ও উৎসাহের ভাষায় কথা বলতেন, আতঙ্কের ভাষায় নয়।
ইমাম নববী (রহ.) এ ধরনের হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, কোনো কাজ যদি মানুষের অন্তরে ভয়, দুশ্চিন্তা বা অস্বস্তি সৃষ্টি করে, তবে তা পরিহার করা ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ। কারণ ইসলাম মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত রাখার ধর্ম, আতঙ্ক সৃষ্টির ধর্ম নয়।
আজ যখন ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনজীবনে ভয়, হুমকি ও মানসিক সহিংসতা নানা রূপে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই নববী নির্দেশনা নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। একজন মুমিনের পরিচয় হবে এমন যে, তার উপস্থিতিতে মানুষ নিরাপত্তা অনুভব করবে, তার কথায় সান্ত্বনা পাবে এবং তার আচরণে আস্থা খুঁজে পাবে।
ভয় সৃষ্টি করা সহজ, কিন্তু মানুষের মনে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি ফিরিয়ে দেওয়া অনেক বড় ইবাদত। তাই আমাদের রসিকতা, কথাবার্তা ও আচরণ যেন কখনো কারও হৃদয়ে আতঙ্কের কারণ না হয়। বরং আমরা এমন সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষ একে অপরের জন্য ভয়ের নয়, বরং শান্তি, আস্থা ও নিরাপত্তার উৎস হয়ে ওঠে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য, এটাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা।




