কিছুই পায়নি বিএনপির ৩১ সঙ্গী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
৩১টি দল। যারা ছিল বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গী। তারাও শিকার হয়েছিল হামলা-মামলার। কথা ছিল সরকার গঠন করলে কিছু পাবে তারাও। অংশ হবে যৌথ পথচলার। কিন্তু সাড়ে তিন মাস কেটে গেছে, পায়নি কেউ কিছু। দলগুলোর নেতারা তাই প্রকাশ করেছেন হতাশা। তবে এই হতাশা প্রকাশের গণ্ডি আটকে রয়েছে নিজেদের মধ্যেই। কারণ বড় দল বিএনপির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কার্যত তাদের যোগাযোগ এখন বন্ধ।
বিএনপি নেতৃত্বে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল ৪২টি রাজনৈতিক দল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়েছিল বিএনপি। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর যুগপতের শরিকদের মধ্য থেকে দুই নেতাকে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করেছে দলটি। তবে মিত্রদের মধ্যে ৩১টি দল এখন পর্যন্ত পায়নি কিছুই। জেলা পরিষদের প্রশাসক কিংবা সংরক্ষিত নারী আসনেও শরিকদের কেউ মূল্যায়িত না হওয়ায় এ হতাশা বেড়েছে আরও। বঞ্চিত দলগুলোর নেতারা এখন ওই দুই প্রতিমন্ত্রীর বাইরে অন্য শরিকদের মধ্য থেকে ‘টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী’ হিসেবে আরও দু-একজনকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চান। বাকিদের যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়নের প্রত্যাশা তাদের। আর ধানের শীষ কিংবা বিএনপির সমর্থনে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করে যারা পরাজিত হয়েছেন, তারা যেতে চান সংসদের উচ্চকক্ষে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গণতন্ত্র মঞ্চের বর্তমান সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ‘ঢাকা-১২’ আসনটি ছেড়েছিল বিএনপি। এই আসন থেকে বিএনপির সমর্থনে নিজ দলের প্রতীক ‘কোদাল’ মার্কায় ভোট করেছিলেন তিনি। তবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় জিততে পারেননি সাইফুল হক। জানতে চাইলে তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে বিএনপি একলা চলার নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কারণে আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই। শরিকদের ব্যাপারে বিএনপি তার অবস্থান ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দিন যত যাবে, হয়তো পরিস্থিতির আরও পরিবর্তন হবে। বিএনপি হয়তোবা মনে করছে, দুই শরিককে দুটি প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে মোটামুটি তারা জাতীয় সরকার গঠন করে ফেলেছে। এ রকমই একটি পরোক্ষ বার্তা তারা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সাইফুল হক আরও বলেছেন, ‘আমাদের ওপর বহুবার হামলা হয়েছে। সেই ত্যাগ-সংগ্রামের যথাযথ রাজনৈতিক মূল্যায়ন এখনো হয়নি।’ তবে তিনি এ-ও বলেছেন, ‘সে মূল্যায়নের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সরকার সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে, আর এত তাড়াহুড়াইবা কীসের, পাঁচ বছর পড়ে আছে না!’
১২ দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিএনপি সরকার ১২ দলীয় জোটসহ আন্দোলনের যারা সাথী, তাদের যোগ্য মূল্যায়ন করতে পারত; কিন্তু তা করেনি। সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা হয়নি। মনে রাখতে হবে, আগামীতে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আশা করি, বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে। অন্যথায় আগামী দিনের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।’
অন্যদিকে, যুগপৎ আন্দোলনের আরেক শরিক গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু আন্দোলনের সময় নিজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে বললেন, ‘চব্বিশের ডামি নির্বাচনের পর বিরোধী দলের গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ছিল। পুলিশ বাধা দিলে আমরা বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল নিয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম। পল্টন মোড় পার হওয়ার পর তিন স্তরের পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শুরু হয় গুলি, ছররা গুলি, টিয়ার গ্যাসের শেল। এতে আমার মাথায় গুলি লেগে স্ক্যাল্পের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ১৩টি সেলাই দিতে হয়েছিল, ১৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।’
শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু মনে করেন, ‘এ ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও যদি শরিকরা রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়িত না হয়, তাহলে তা হতাশার জন্ম দেবে এবং ভবিষ্যতের ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।’
একাধিক দলের নেতারা অনুযোগের সুরে বলেছেন, বিএনপির বর্তমান আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, বিপদে বা রাজনৈতিক চাপে না পড়লে হয়তো শরিকদের খোঁজখবর নেবে না তারা। জামায়াতে ইসলামী ভবিষ্যৎ ভেবে সংরক্ষিত নারী আসন সম্পর্কে যে কৌশল নিয়েছে, তা তাদের জোটকে আরও সংহত করেছে। অন্যদিকে বিএনপি সেখানে উল্টো অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের প্রসঙ্গ টেনে যুগপৎ আন্দোলনের এক নেতা জানিয়েছেন, ১২ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে ফরম সংগ্রহ করে সাক্ষাৎকারের জন্য হাজির হয়েছিলেন বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডে। কিন্তু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় তার বিষয়টি বিবেচনায়ই নেয়নি বোর্ড।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান শরিকদের মূল্যায়নের বিষয়ে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শরিকদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর দুই দলের দুই নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী মিত্রদের প্রত্যেককে যাতে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়, সে ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনোযোগ আছে।’




