জোটের রাজনীতিতে এনসিপির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
- সামান্তা শারমিনের পদত্যাগে ফের আলোচনায়
- এই পদত্যাগকে দলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন না এনসিপি নেতারা
- জামায়াত জোটে থাকলেও নিজস্ব রাজনীতি নিয়েই এগোচ্ছেন বলে দাবি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটের সিদ্ধান্তের পর থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক পরিচয়, নারী নেতৃত্বের অবস্থান এবং সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে চলছে আলোচনা। জোটের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে এর আগে দল ছেড়েছেন জনপরিসরের চেনা মুখ কয়েক নারী নেতা। এবার একই ধরনের প্রশ্ন সামনে রেখে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তার পদত্যাগে এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে দলটির নেতারা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য মানেই এনসিপির রাজনৈতিকভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজস্ব পরিচয় ও কর্মসূচি নিয়েই সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সামান্তা শারমিন গত বৃহস্পতিবার ফেসবুকে বিবৃতি দিয়ে দেন এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা। পদত্যাগের কারণ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোট, কাউন্সিল ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি এবং নারী প্রশ্নে দলের অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, ১১ মাস ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত প্রস্তাব, আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। দল ভুল পথে গেলে তা থেকে ফিরিয়ে আনা নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেই অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
সামান্তার ভাষ্য, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে এনসিপিকে। তার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রকাঠামোর ধারণার সঙ্গে এনসিপির ঘোষিত অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জোটের কারণে সেই পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।
সামান্তার পদত্যাগের আরেকটি প্রেক্ষাপট দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন। গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এর আগে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকলেও নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় তাকে। পদ পরিবর্তন নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও বিবৃতিতে কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, নেতৃত্ব নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সামান্তার পদত্যাগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর আগে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যের বিরোধিতা করে এনসিপি ছেড়েছিলেন দলটির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তাদের পদত্যাগের ঘটনাও দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও জোটের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল।
তাসনিম জারা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এনসিপি ছাড়েন। সে সময় জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। অন্যদিকে তাজনূভা জাবীন দল ছাড়ার পাশাপাশি নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়ান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোটের পর দলটি ৩০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ পায়। এ সিদ্ধান্তও দলের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। তবে জোটের বিরোধিতা করা কয়েকজন নারী নেত্রীর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান একরকম ছিল না। নুসরাত তাবাসসুম পরে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হন।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের বিবৃতিতে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার বক্তব্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধের অংশীদার ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন এনসিপির নেতারা। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার আগামীর সময়কে বললেন, ‘নারী নেত্রী হিসেবে সামান্তা শারমিনকেও এনসিপি তৈরি করেছে। ভবিষ্যতেও দল নতুন নারী নেতৃত্ব তৈরি করবে।’
তার দাবি, এনসিপিতে এখনো অনেক নারী নেতা রয়েছেন। দলের নারী সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রেও সামান্তা শারমিনের কোনো ভূমিকা ছিল না।
দলের দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনার ভাষ্য, ‘দু-একজনের অবস্থান দেখে পুরো এনসিপির নারী নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়।’
তার দাবি, দলে যথেষ্ট নারী নেতৃত্ব রয়েছে এবং নারী শক্তিকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের দলে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলেও জানালেন তিনি।
সামান্তার পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তার সাবেক রাজনৈতিক সহকর্মী ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। সামান্তার প্রশংসা করে তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘রাজনীতিতে কথা বলতে আসা মানুষের অভাব নেই, কিন্তু অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মানুষ কম। সামান্তা তাদেরই একজন। তার মতে, সামান্তার রাজনৈতিক পথচলা এখনো অনেক বাকি।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা আব্দুল কাদের এনসিপির বর্তমান আদর্শ ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, অভ্যুত্থানের পর দেশ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে অনেক তরুণ সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি; অনেকে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন। আব্দুল কাদেরের মতে, তরুণদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও এনসিপির বর্তমান কার্যক্রমের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তবে দলটির নেতারা পদত্যাগের ঘটনাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম বললেন, ‘রাজনৈতিক দলে কেউ পদত্যাগ করবেন, কেউ নতুন করে যুক্ত হবেন— এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে এনসিপিতে কোনো অস্থিরতা নেই।’ তার দাবি, দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সারোয়ার তুষারও সামান্তার পদত্যাগকে দলের জন্য বড় কোনো ধাক্কা হিসেবে দেখছেন না। তার ভাষ্য, নির্বাচনের আগেই এনসিপি ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে এনসিপি হারিয়ে যাচ্ছ— এমন বক্তব্যের জবাবে বললেন, ‘বিষয়টি মূলত মতাদর্শিক জায়গা থেকে বলা হচ্ছে; বাস্তবতা ভিন্ন। এনসিপি যদি জামায়াতে বিলীন হয়ে যেত, তাহলে জোট না করে দুই দল একীভূত হয়ে যেত। দল নিজস্ব রাজনীতি ও কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে এবং আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এককভাবে অংশ নেবে।’





