একান্ত সাক্ষাৎকারে মুনতাছির আহমাদ
কিছু সংগঠন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, কিছু উপেক্ষিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ভূমিকা, আন্দোলনের কৌশল, সমন্বয়, ৫ আগস্টের প্রস্তুতি এবং আন্দোলন-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন সংগঠনটির সভাপতি মুনতাছির আহমাদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমজাদ হোসেন হৃদয়।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিল ইসলামী ছাত্র আন্দোলন?
মুনতাছির আহমাদ : হাইকোর্ট ৬ জুন ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের রায় দেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যানারে যে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়, সেখান থেকেই আমাদের সম্পৃক্ততা। আন্দোলনের সূচনা থেকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত রাজপথের কর্মসূচি, সাংগঠনিক সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সক্রিয় ছিল। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলায় নেতাকর্মীদের আন্দোলনে যুক্ত করা হয়। আন্দোলনের শুরু থেকেই সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে থাকার নির্দেশনা ছিল।
আগামীর সময় : কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে আপনাদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল?
মুনতাছির আহমাদ : আন্দোলনের শুরু থেকেই সমন্বয়কদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ৩০ জুনের পর আন্দোলন নতুন গতি পেলে শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতেও আমাদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সামনে না রাখার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল, আমরা সেটি সম্মান করেছি। তাই সামনে দৃশ্যমান না হলেও জনশক্তি, সাংগঠনিক সহযোগিতা, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমরা সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ত ছিলাম। সে সময় সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে এই সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলাম।
আগামীর সময় : কখন মনে হলো, আন্দোলনটি আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই?
মুনতাছির আহমাদ : ১৪ থেকে ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাগুলোই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। পরদিন ছাত্রলীগের হামলা এবং ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি আর শুধু কোটা আন্দোলন নয়; সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
আগামীর সময় : আন্দোলন সর্বজনীন করতে কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
মুনতাছির আহমাদ : ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর আমরা আন্দোলনের পরিসর আরও বিস্তৃতের উদ্যোগ নিই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। ১৬ ও ১৭ জুলাই আমাদের উদ্যোগে বিভিন্ন কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো রাজপথে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। পরে হাটহাজারী, ফরিদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। একই সময়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মসূচিও আন্দোলন আরও বিস্তৃত করতে ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সামনে না রাখার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল, আমরা সেটি সম্মান করেছি। তাই সামনে দৃশ্যমান না হলেও জনশক্তি, সাংগঠনিক সহযোগিতা, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমরা সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ত ছিলাম
আগামীর সময় : মাঠপর্যায়ে আপনাদের সাংগঠনিক কৌশল কী ছিল?
মুনতাছির আহমাদ : আমরা এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছিলাম। যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ ও শহীদ মিনার— প্রতিটি এলাকায় আলাদা টিম ছিল। সংশ্লিষ্ট এলাকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যাতে কর্মসূচিগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
আগামীর সময় : ৫ আগস্টের আগে এবং সেদিনের জন্য আপনাদের কোনো বিশেষ প্রস্তুতি ছিল?
মুনতাছির আহমাদ : ৩, ৪ ও ৫ আগস্ট ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়। চারদিকে গুলি, গ্রেপ্তার, চেকপোস্ট— সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তবুও আমরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখি। ৩ আগস্ট হাইকোর্ট অভিমুখে এবং ৪ আগস্ট শাহবাগ পর্যন্ত বিক্ষোভ করি। ৪ আগস্ট চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, এখন আর আলোচনার সুযোগ নেই— এক দফা, এক দাবি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ। তখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে ৫ আগস্টের কর্মসূচি আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। সেদিনের গণজোয়ার ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
আগামীর সময় : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কতজন নেতাকর্মী শহীদ হন?
মুনতাছির আহমাদ : আমাদের সংগঠনের ১৫ সদস্য শহীদ হয়েছেন। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর পরিবারের শহীদের সংখ্যা ২২ জন। এ ছাড়া প্রায় ২০০ নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেকেই এখনো গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আছেন, কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, আবার কেউ স্থায়ী শারীরিক জটিলতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
আগামীর সময় : শহীদদের মধ্যে কোন ঘটনা আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়?
মুনতাছির আহমাদ : নরসিংদীর ১৪ বছর বয়সী শহীদ তাহমিদের ঘটনা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশ তাকে গুলি করে। পরে যখন তার মরদেহ স্ট্রেচারে করে নেওয়া হচ্ছিল, তখনো সেই স্ট্রেচারের ওপর হামলা চালানো হয় এবং মরদেহ লক্ষ্য করেও গুলি করা হয়। এমন নৃশংসতা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনা করা যায় না।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলনে সৈয়দ রেজাউল করীমের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুনতাছির আহমাদ : রাজনৈতিক পরিসরে যদি কারও নেতৃত্ব বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়, তাহলে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নাম অবশ্যই আসবে। আবু সাঈদ হত্যার পর তিনি এক দিনও অপেক্ষা না করে রাজপথে নেমেছেন। স্পষ্টভাবে বলেছেন, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যা করা হলে একজন অভিভাবক হিসেবে ঘরে বসে থাকা যায় না। শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের নয়, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসন ও সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমার কাছে জুলাই আন্দোলনে তার এই অভিভাবকসুলভ ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আগামীর সময় : গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী ছাত্র আন্দোলন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছে কি?
মুনতাছির আহমাদ : আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় রাষ্ট্রীয় কোনো পদ বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চিন্তা আমাদের ছিল না। লক্ষ্য ছিল দেশের সংকট থেকে উত্তরণ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তবে এটাও সত্য, আন্দোলনে সম্পৃক্ত সব ছাত্রসংগঠনকে সমানভাবে মূল্যায়নের যে সুযোগ ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু সংগঠন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কিছু সংগঠনকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশও সেই উপেক্ষার শিকার। বলা যায় সবচেয়ে আন্ডাররেটেড ছাত্রসংগঠন।
আগামীর সময় : আপনার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি কোনটি?
মুনতাছির আহমাদ : আন্দোলনের জন্য আমাদের পরিকল্পনা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও কৌশল ছিল। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি বিশ্বাস করি, মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই এই অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। মানুষ ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছে, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছে— এই ঐক্য ও আত্মত্যাগের পেছনে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ছিল বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
মুনতাছির আহমাদ : জুলাই আমাদের শিখিয়েছে অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো শক্তিই স্থায়ী হতে পারে না। শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, আলেম-উলামা ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণই ছিল এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি। যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন বাংলাদেশে আর কখনো বৈষম্য, দমন-পীড়ন বা স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি হবে না।
আগামীর সময় : জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হলো?
মুনতাছির আহমাদ : জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও সহনশীল একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার পরিবেশ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
আগামীর সময় : আপনার দৃষ্টিতে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কী?
মুনতাছির আহমাদ : সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হলো, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার এখনো হয়নি। সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে অনেক পুরনো সমস্যাই রয়ে গেছে। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের যে স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়, নীতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। ইসলামী শাসনব্যবস্থা হতে পারে কার্যকর নীতি, তাহলে জনগণের এই না পাওয়ার আক্ষেপগুলো পূরণ করা সম্ভব। এই মুক্তি নিশ্চিতেই ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ ২৪-পরবর্তী পথচলা আরও দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছে।






