সম্পাদকীয়
আত্মতুষ্টি ও অপুষ্টি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে কৃষির সাফল্যের কথা সর্বজনবিদিত। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদনে দেশ অনেক ক্ষেত্রেই আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়েছে। প্রতি বছরই কোনো না কোনো ফসলের বাম্পার ফলনের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। কিন্তু এ উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালে একটি নীরব সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে— খাদ্যের পরিমাণ বাড়লেও পুষ্টিগুণ কমছে আর সেই সঙ্গে বাড়ছে আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে একসময় শুধু পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাপ্যতাকেই বোঝানো হতো। এখন বিশ্ব জুড়ে এর সংজ্ঞা অনেক বিস্তৃত। খাদ্য থাকতে হবে নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সবার নাগালের মধ্যে। একটি শিশু যদি পেট পুরে ভাত খায় কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান না পায়, তাহলে তাকে প্রকৃত অর্থে সফলতা বলা যায় না।
উৎপাদনে বাংলাদেশ গড়ছে নতুন ইতিহাস। উৎপাদন ভালো হলেও অনিরাপদ খাদ্যের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে খোদ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) মূল্যায়নে। ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে তুলে ধরা হয়েছে এসব বিষয়। গতকাল রবিবার ‘আগামীর সময়’-এ এই বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অতিরিক্ত ফলনের লক্ষ্যে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে, মাটির জৈব উপাদান কমেছে এবং খাদ্যশস্যের পুষ্টিমানেও প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনও এ সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে অনেক ফসলের মধ্যে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ আমরা হয়তো বেশি খাদ্য উৎপাদন করছি, কিন্তু সেই খাদ্যের গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বজায় থাকছে না।
অন্যদিকে দেশের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। প্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। ফলে একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি সমানতালে বাড়ছে। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। শিশু-কিশোরদের এ বাস্তবতা পরবর্তী প্রজন্ম মেধা ও পুষ্টিহীন হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটি দেশের মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর। পুষ্টির সংকট শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের জন্যও বাধা।
এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে নয়, পুষ্টিনির্ভর কৃষির দিকে দিতে হবে। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা, পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের চাষ বাড়ানো এবং খাদ্যের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। স্কুলভিত্তিক পুষ্টি শিক্ষা কর্মসূচি চালু করা, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণও জরুরি।
এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাও কম নয়। শুধু পেট ভরানো নয়, সুষম খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাদ্যকে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দিতে হবে।
বাম্পার ফলনের সাফল্যে আত্মতুষ্টির সময় হয়নি। খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টির মান নিশ্চিত করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আজ যদি আমরা মাটির স্বাস্থ্য, খাদ্যের গুণগত মান এবং শিশুদের পুষ্টির বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী প্রজন্মের সুস্থ বিকাশ ও দেশের টেকসই উন্নয়ন দুটিই হুমকির মুখে পড়বে। খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ তখন আর শুধু শস্যভরা গোলা নয়, বরং পুষ্টিসমৃদ্ধ, নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত থাকবে।







