সম্পদ যেন বোঝা না হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী পরিবার-সমাজ, দেশ-জাতির জন্য একসময় সোনালি অবদান রেখেছেন, শুধু সময়ের পার্থক্যে তিনি বা তারা জাতির কাঁধে বোঝা হয়ে যান বয়সের কাছে হেরে গিয়ে। বয়স বেড়ে প্রবীণ হওয়া প্রাকৃতিক নিয়ম হলেও তাদের বোঝা হিসেবে না নিয়ে বরং সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। এমনকি তাদের অভিজ্ঞতা ও মেধা উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। গতকাল শনিবার ‘আগামীর সময়’-এ প্রকাশিত ‘ধেয়ে আসছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ’ শিরোনামে প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, জনমিতিক লভ্যাংশের সময়সীমা শেষে বাড়বে নির্ভরশীল গোষ্ঠীর সংখ্যা। যদিও বাস্তব চিত্র হলো, এখনো কর্মক্ষম বয়সের বড় একটি অংশ রয়েছে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে। তবে এখনো সঠিক এবং বাস্তবসম্মত নীতি দ্রুত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল মিলবে কিছুটা। তা না হলে উল্টো এই বিপুল জনগোষ্ঠী পরিণত হতে পারে জনমিতিক বোঝায়।
কোনো একটি দেশের জনসংখ্যার জন্ম ও মৃত্যুহার কমে গেলে জনসংখ্যার বয়স-কাঠামোতে যে পরিবর্তন আসে এবং এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাকে বলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। এ বাস্তবতা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত নানা চ্যালেঞ্জেরও পূর্বাভাস দিচ্ছে। আজ যে প্রবীণ জনগোষ্ঠী সীমিত পরিসরে নানা সমস্যার মুখোমুখি, আগামী এক-দুই দশকে তাদের সংখ্যা আরও বাড়লে পরিস্থিতি বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই এখনই সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
দেশে অধিকাংশ প্রবীণ ব্যক্তি পেনশন বা নিয়মিত আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কর্মক্ষমতা হারানোর পর অনেকেই সন্তান বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু নগরায়ণ, একক পরিবারব্যবস্থার বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে তরুণরা দূরে চলে যাচ্ছেন। এ কারণে প্রবীণরা ক্রমে একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। অনেকের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং মানসিক সেবাও নিশ্চিত হচ্ছে না।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা নীতির সঙ্গে প্রবীণ কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বয়স্ক ভাতার আওতা ও পরিমাণ বৃদ্ধি, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তৃণমূল পর্যায়ে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠারও দাবি রাখে। সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে উৎসাহিতও করা যেতে পারে।
সবকিছুর আগে পরিবারকে এগিয়ে আসা জরুরি। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সব পরিবারের পক্ষে প্রবীণদের পুরো দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। পিতামাতার ভরণপোষণের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা ও সন্তানের দায় থাকলেও বাস্তবতার কারণে তা ক্ষেত্রবিশেষে পালন সম্ভব হয় না। সন্তান অপারগতা প্রকাশ করে আত্মসমর্পণ করলে তার পরবর্তী করণীয় কী হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা কোনো অভিশাপ নয়; এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি হতে পারে অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার এক মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু অবহেলা ও পরিকল্পনার ঘাটতি ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। তাই এখনই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রবীণদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।




