সম্পাদকীয়
দরকার দুর্নীতি কমানো, বাড়ালেন দাম

তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে গণদাবি উপেক্ষা করে বিদ্যুতের দাম আবার বাড়িয়েছে সরকার। এবার বৃদ্ধির পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছি আমরা।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড়মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। ২৫ বছরে এবারই একবারে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো।
এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে অন্তত ৬০ শতাংশ। এটা যাবে সাধারণ আয়ের মানুষের পকেট থেকে। দেশে সীমিত ও সাধারণ আয়ের মানুষই বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কেন এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর ধারাবাহিকতা এখনো চলছে! যুগ যুগ ধরে বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফল ভোগ করছেন ভোক্তাসাধারণ। ভোক্তাদের পকেট কেটেই এ খাতের লোকসান মেটানো হয়েছে। ভোক্তা বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক বা না করুক, মাস গেলে নানা ধরনের বিল পরিশোধ করতেই হয়। এবারও গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু গণদাবিকে সরকার আমলে নেয়নি। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের সহযোগী ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি আবারও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করে। কোম্পানিগুলোর খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অন্যায্য প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে মূল্য বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে নেওয়া যেত যদি এ খাতে সরকার অপচয় ও দুর্নীতি রোধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর নজির তৈরি করতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা দাম বাড়ানোর পুরনো চক্রই বজায় রেখে চলেছে। ছয়টি কোম্পানির মামাবাড়ির আবদার পূরণের লক্ষণ দেখে সংবাদমাধ্যমগুলো যখন সোচ্চার, তখন আমরাও এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে সংবাদ ও সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করি। পরিতাপের বিষয়, এসব আবেদন-নিবেদন ও সমালোচনা ‘কুম্ভকর্ণ’দের কর্ণে প্রবেশ করেনি!
এ বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানও দুঃখজনক। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ও সংসদ বিদ্যমান। গণদাবির প্রেক্ষিতটা সেখানে উত্থাপন ও আলোচনা করা যেত। বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়া মোটেও সমীচীন হয়নি।
দেশবাসী ভুলে যায়নি, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি
(বিশেষ বিধান)’
আইনের মাধ্যমে এ খাতের চুক্তিগুলোকে আইনি জবাবদিহি ও আদালতের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। সেই দায়মুক্তি সংস্কৃতির কারণেই বিদ্যুৎ খাত লুটপাটের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সেই লুটপাট বন্ধ না করে উল্টো জনগণের পকেট থেকে টাকা খসাতে রেকর্ডভাঙা দাম বাড়ানো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এ কথা মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম শর্ত গণদাবিকে আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সমালোচিত ও নিন্দিত অথচ জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিকাশের অন্যতম সোপান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে স্বচ্ছ রাখা জরুরি। জনগণের
কল্যাণে এ খাতকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের মধ্যে জাতীয় উন্নয়ন ও মঙ্গল নিহিত। এ খাতের দুর্নীতি রোধ না করে মূল্য বাড়ানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই।




