তিয়েনআনমেনের বিক্ষোভ দমনকে দৃঢ় সমর্থন শির

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
তিয়েনআনমেনে ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ঘটনাটি এখনো চীনের রাজনীতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। বিক্ষোভটি পার্টির সিদ্ধান্তে চীনা সেনাদের হাতে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল।
সোমবার চীনের সাবেক নেতা জিয়াং জেমিনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে শি এমন মন্তব্য করেছেন।
শি বলেছেন, ‘১৯৮৯ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মের মধ্যবর্তী সময়ে চীন একটি গুরুতর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়। কমরেড জিয়াং জেমিন দৃঢ়ভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সঠিক সিদ্ধান্তগুলো সমর্থন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন।’
ওই বছরের এপ্রিলে সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি নেতা হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুর পর বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। উদারপন্থার সমর্থক হিসেবে পরিচিত হু ৭৩ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুতে ব্যাপক শোক তৈরি হয়।
এর কয়েক দিন পর হাজারো শিক্ষার্থী বেইজিংয়ের রাস্তায় নেমে আরও গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জমায়েত বাড়তে থাকে।
পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ জুন রাতে পিপলস লিবারেশন আর্মি ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে স্কয়ারে প্রবেশ করে। সেনারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায় ও ট্যাংক দিয়ে পিষে ফেলে।
৪ জুনের মধ্যে পুরো চত্বর নিয়ন্ত্রণে নেয় সেনাবাহিনী। চীন সরকারের মতে নিহত হন দুই শতাধিক মানুষ।
রেড ক্রস ও বিদেশি বিভিন্ন সূত্রের মতে নিহত মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছিল। বিশ্বজুড়ে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
চীনে এই ঘটনা নিয়ে কঠোর সেন্সরশিপ রয়েছে এবং দেশটির নতুন প্রজন্ম এ বিষয়ে খুবই কম জানে।
জিয়াং জেমিনের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভের উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে। তিনি ওই সময় সাংহাইয়ের মেয়র ছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সেনা ও ট্যাংক নামিয়ে তিয়েনআনমেন স্কয়ার খালি করার পার্টির সিদ্ধান্তকে তিনি সমর্থন করেছিলেন।
সাংহাইয়ে বিক্ষোভ কঠোরভাবে সামরিক বলপ্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ায় তাকে শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়। হত্যাকাণ্ডের কয়েকমাস পর, নভেম্বরে তাকে চীনের সর্বোচ্চ নেতা বা পার্টির সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
১৯৯৩ সালের মধ্যে জিয়াং চীনের নিরঙ্কুশ নেতা হয়ে ওঠেন।
গত সপ্তাহে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে প্রচারিত জিয়াংয়ের জীবন নিয়ে ১২ পর্বের তথ্যচিত্রেও তা তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেখানে ১৯৮৯ সালের হত্যাকাণ্ডের কোনো দৃশ্য দেখানো হয়নি।
চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট থেকে তিয়েনআনমেনের সেই ঘটনাগুলোর ছবি ও আলোচনা নিয়মিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। আজও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা ঝুঁকিপূর্ণ।
সোমবারের আলোচনায় জিয়াংয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অর্জনের কথা তুলে ধরার সময় শি বিরলভাবে তিয়েনআনমেনের প্রসঙ্গও এনেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ইতিহাস টেনে শি দেশের জনগণকে ‘অদম্য লড়াইয়ের মনোভাব’ নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে হাজারো কর্মকর্তা ও প্রতিনিধির সামনে ৪৫ মিনিটের ভাষণে শি বলেছেন, চীন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
তিনি বলেছেন, ‘অদম্য লড়াইয়ের মনোভাব ও অসাধারণ সক্ষমতা নিয়ে আমরা উত্তাল সমুদ্র কিংবা ভয়াবহ ঝড়—যেকোনো বড় চ্যালেঞ্জ সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করব।’
জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে শি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতার ‘দুটি বড় বিস্ময়’-এর নতুন অধ্যায় লেখা হবে।
ভাষণটির গুরুত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে উপস্থিত অতিথিদের তালিকাতেও। চীনের ক্ষমতাধর পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সাত সদস্যের সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাবেক দলীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সোমবারের ভাষণে শি চীনের অর্জন তুলে ধরে বলেছেন, ‘মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে।’ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও তার এই বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে।
সূত্র : সিএনএন









