অর্থনীতি
সংকট বেশি স্বস্তি কম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজ থেকে ছয় মাস আগে যাত্রা শুরু করেছিল বিএনপি সরকার। তখন জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা, ডলারের উচ্চমূল্য, বাণিজ্যে অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে চলছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা। এর সঙ্গে ছিল দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, েফাকলা হয়ে যাওয়া ব্যাংক খাত, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজস্বে দুর্বল ভিত্তি। এ সূচকগুলো এখনো কািঙ্ক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি; বরং সাম্প্রতিককালে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে কিছুটা স্বস্তি এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সপ্রবাহে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি, কৃষক ও প্রবাসী কার্ড চালু এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল রবিবার আগামীর সময়কে বলেছেন— অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকারের ছয় মাসে অর্থনৈতিক উদ্যোগের দিকনির্দেশনা মোটামুটি সঠিক হলেও বাস্তবায়নে আরও গতি ও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংক খাত সংস্কারে কর্মপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানিতে পড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গ্যাস আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজার মনিটরিং যথেষ্ট নয়; বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি এ মুহূর্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। গত মার্চে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে তা ৮ দশমিক ৩১ শতাংশে বিরাজ করছে। এটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে মনে করছেন না অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয়ের মূল্য ক্ষয় এবং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ হিসেবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমাতে গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়বে। দেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশ খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত।
এদিকে বিনিয়োগের দুর্বলতা আরও উদ্বেগজনক। গত অক্টোবর-ডিসেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ৩৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরবর্তী তিন মাসে আরও ৪৪৭ মিলিয়ন ডলার আসে বিনিয়োগ। যদিও ক্ষমতায় আসার পর সরকার শুরুতে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। এজন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্মেলন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর প্রণোদনা বা নতুন প্রতিষ্ঠান কম নেই; কিন্তু এখন পর্যন্ত বিনিয়োগের মন্থরগতি কাটছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। এ সংকট বিনিয়োগ দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, গ্যাসের ঘাটতি এবং সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার ঘটনা দেখিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থায় স্থিতিস্থাপকতা সীমিত।
সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ঢাকায় সফর শেষ করা ২৫ মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের এর নিশ্চয়তা চেয়েছেন। এ ছাড়া দেশীয় উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেবেন বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আগামীর সময়কে বলেছেন, শিল্পে জ্বালানিসংকট এখন উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ডিজেল, এলপিজিসহ বিকল্প জ্বালানির ব্যয়। এতে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমছে। শিল্প সচল না থাকলে রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান— সবক্ষেত্রেই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এর মধ্যে দুর্বল ঋণ আদায় ও সুশাসনের অভাবে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। বলতে গেলে সরকার এই খেলাপি ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। জুনের হিসাব এখন প্রকাশ হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিসংখ্যান আরও বাড়বে। খেলাপি ঋণসহ ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য।
মূলত দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং পুনঃপুন ঋণ পুনঃ তফসিল বর্তমান সংকটকে গভীর করেছে। কিছু ব্যাংকে পুনর্গঠন বা পুনর্মূলধন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যবহারের আগে সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, দায়ী পরিচালকদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ উদ্ধারের পরিকল্পনা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায় সংস্কারের নামে পুরনো ক্ষতির দায় করদাতার ওপর স্থানান্তর হবে।
সরকারের এ সময়ে রিজার্ভ ও রপ্তানিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও রপ্তানিতে ফের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। গত মার্চে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক ছিল ২৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা জুলাইয়ে বেড়ে ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্সও বেড়েছে। এতে বহিঃখাত কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। গত মার্চে যেখানে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে জুলাইয়ে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৫১ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি গত মার্চে রপ্তানি আয় ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার এবং জুলাইয়ে অর্জন হয়েছে ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার। ফলে রপ্তানির দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক সুরক্ষাকে আরও সমন্বিত করতে পারে এবং নারীর হিসাবে সরাসরি অর্থ দেওয়া ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কারা প্রকৃত দরিদ্র, কারা বাদ পড়ছেন, পুরনো ভাতাগুলো কীভাবে সমন্বিত হবে, একজন একই সঙ্গে একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, এসবের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছাড়া দ্রুত সম্প্রসারণ করলে অপচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব— দুটিই বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, সরকার যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, তা অত্যন্ত কঠিন। অর্থনীতি বহু দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির অবস্থায় ছিল, ব্যাংক খাত দুর্বল, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং ব্যাংক অর্থায়ন করছে না। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সরকারের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শেয়ারবাজার বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।






