প্রশাসন
পে-স্কেলে আশা, কাটেনি অস্থিরতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও প্রশাসনে কাটেনি অস্থিরতা। বরং পদোন্নতি, পদায়ন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ওএসডি ও বাধ্যতামূলক অবসর— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি হারানো এবং ওএসডি হওয়ার আতঙ্ক, অন্যদিকে পদোন্নতি-পদায়নে নানা সিদ্ধান্ত ও তার পরবর্তী পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ— সব মিলিয়ে প্রশাসনের ভেতরে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। এর মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণায় কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও ছয় মাসে প্রশাসন সংস্কারের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
চলতি মেয়াদে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে আজ সোমবার। এ সময়ে সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ জুড়েই ছিল কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা। সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অন্তত ৫১৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৯ জন সচিবসহ ১০৯ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আছেন। জনপ্রশাসনে সংযুক্ত ১১ জন সচিবসহ প্রায় ১৬৫ জন কর্মকর্তা রয়েছেন ওএসডি হয়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা রাখার অভিযোগে একজন সচিবসহ ৩৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পাওয়া ২৭তম বিসিএসের ৯৬ কর্মকর্তাকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশাসনের অস্বস্তি শুধু পদোন্নতি কিংবা ওএসডিতে সীমাবদ্ধ নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রশাসনসংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য। আগে ‘সরকারি কর্মচারী বাতায়ন’-এ সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ও সংখ্যার তালিকা পাওয়া যেত। এখন সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের নাম ছাড়া আগের মতো ক্যাডার কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও ওএসডি কর্মকর্তাদের তথ্যও আর প্রকাশ করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদস্থ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব তথ্য সরকারের কাছে গোপনীয়। ওপরের নির্দেশেই ওয়েবসাইট থেকে তথ্যগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম আসা, নিয়োগ দেওয়ার পর তা বাতিল করা, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ ও বদলি নিয়ে প্রশ্ন, বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে দায়িত্বহীন রাখা— এমন নানা ঘটনায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এমনকি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত সরকারকে পিছু হটতে হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব মো. মাইনুল হক ভূঁইয়ার পদোন্নতি। অবসরে যাওয়ার পরও তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির তালিকায় রাখা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে পরে সেই আদেশ বাতিল করা হয়। গত ছয় মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ২২। এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা প্রশাসন পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতাকেই সামনে আনছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন সংস্কারের যে আলোচনা ও উদ্যোগ ছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার বড় কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। ফলে পুরনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়ার ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসন সংস্কারের বড় উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি। বরং প্রশাসন আরও দুর্বল হয়েছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দক্ষ, যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখনো সে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রশাসনে কথিত ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে অভিযোগ। প্রশাসনসংশ্লিষ্টদের দাবি, বিশেষ একটি জেলার কর্মকর্তাদের নিয়ে শক্তিশালী একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ওই জেলার বাসিন্দা হলেই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের সুযোগ মিলছে— এমন অভিযোগও রয়েছে। কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু আঞ্চলিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিপরীতে অন্য জেলার কর্মকর্তারা বিএনপিপন্থী হলেও তাদের ‘আওয়ামী ট্যাগ’ বা ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফলে ছয় মাসে ৫১৯ কর্মকর্তার পদোন্নতি, নতুন নিয়োগ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরের হিসাব যতটা বড়, প্রশাসনে স্থিতি ফেরানোর প্রশ্নটি ততটাই অনিষ্পন্ন। পে-স্কেলের ঘোষণায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও পদায়ন, পদোন্নতি ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।






