জ্বালানি
গ্যাস দুর্যোগই বড় চ্যালেঞ্জ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক ১১ দিনের মাথায় উত্তপ্ত হয়ে উঠল মধ্যপ্রাচ্য। ইরানের সামরিক স্থাপনা আর পারমাণবিক কর্মসূচি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করল ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে বিশ্ব জুড়ে শুরু হলো হুলস্থুল। জ্বালানি তেলের দাম তো অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়ছিলই, সেই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছিল সরবরাহ। সে সময় অনেকটা বাধ্য হয়েই নতুন সরকার দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ায়। এ নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষের মধ্যেই বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের মানুষের হাতে যায় ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। আর সবশেষ এক মাস ধরে ভুগতে হচ্ছে ভয়াবহ গ্যাসসংকট আর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায়।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে এমন নানামুখী সংকট, অসন্তোষ আর চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে ছয় মাস পার করল জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম নির্বাচিত সরকার। এ সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকবারই সরকারের পক্ষ থেকে জনদুর্ভোগের কারণে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সবশেষ গত শনিবারই ঢাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটের জন্য দেশের মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চলমান সংকট নিয়ে আগামীর সময় কথা বলেছে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে। তারা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ দেড় দশকে গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা, আমদানিনির্ভরতার ঝোঁক, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ নানা অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এ সংকট অবশ্যম্ভাবী ছিল। রাতারাতি কোনো সমাধান না এলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন করলে সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে।
জ্বালানি তেল নিয়ে হুলস্থুল: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেলের দাম। ব্যাহত হয় জ্বালানি তেল এবং এলএনজি আমদানি। তেলের সংকট হতে পারে এমন হুজুগে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোয় পড়ে দীর্ঘ লাইন। পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ আছে— সরকারের এমন আশ্বাসের পরও তেলের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। অনেকে শুরু করেন মজুদ। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ পর্যন্ত তেল বিক্রি হয় কয়েক দিনে। বাধ্য হয়ে রেশনিং এবং অ্যাপের মাধ্যমে তেল বিক্রি শুরু হয়। সে সময় প্রায় এক থেকে দেড় মাস জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।
তেল-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি: দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার আশ্বাস দিয়েছিল বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম না বাড়ানোর। কিন্তু বিশ্ববাজারের অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে না পেরে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম।
এই বাড়তি দামের ধকল কাটতে না কাটতেই মার্চে বিদ্যুতের দাম বাড়ে রেকর্ড পরিমাণ। চরম অসন্তোষ তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি ছিল, বিদ্যুতে অতিরিক্ত ভর্তুকি কমাতেই এই দাম বৃদ্ধি। যদিও অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণের জন্যই অস্বাভাবিক হারে বাড়ে বিদ্যুতের দাম।
অন্যদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাস এবং সিএনজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে জ্বালানি বিভাগে, যা এখনো পর্যালোচনাধীন।
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণা: মে-জুন মাসে বিদ্যুৎ বিল হাতে পেতেই গ্রাহকরা দেখতে পান, স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ, তিন গুণ বা তারও বেশি বিল এসেছে। দেশ জুড়ে দেখা দেয় তীব্র অসন্তোষ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এসব অভিযোগের সুরাহার নির্দেশনা পেয়ে বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি কোনো সুরাহা। গত মাসেও বাড়তি বিলের অভিযোগ তুলেছেন অনেক গ্রাহক।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, ব্যবহার বেশি হওয়ায় বিল বেড়েছে। কিন্তু তার প্রমাণ মেলেনি। বরং মে-জুন মাসে অতিরিক্ত বিলের বোঝা চাপিয়ে সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়ানোর যে ‘দুষ্টুবুদ্ধি’ বিতরণ সংস্থা বিশেষ করে আরইবির মধ্যে ছিল, এবারও এর পুনরাবৃত্তির অভিযোগ ওঠে। অবশ্য কয়েকজন গ্রাহকের বেশি ব্যবহারের কারণে বিল বেশির প্রমাণও মিলেছে। যদিও সেই সংখ্যা খুবই কম।
বেসরকারীকরণ নিয়ে ক্ষোভ-উদ্বেগ: নানা সংকটের মধ্যেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে নেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। কিছুদিন পর বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়েও শুরু হয় তোড়জোড়। এ নিয়েও তৈরি হয় ক্ষোভ।
গ্যাস-বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট: কয়েক বছর ধরেই গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, পুরনো বকেয়ার চাপ, বিশ্ববাজারে অস্থিরতাসহ নানা কারণে এই সংকটের পালে দেয় হাওয়া। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ করেই জাতীয় গ্রিডে দৈনিক কমবেশি ৫০ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ১৫ দিন পর টার্মিনালটি আংশিক সচল হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। গত সপ্তাহে সামিটের একটি টার্মিনালে এলএনজি কার্গো নিয়ে টানাপড়েনের কারণে সরবরাহ ফের কমে।
গ্যাসসংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং ছাড়িয়ে যায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও হামলার ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দেন বিদ্যুৎকর্মীরা। ক্ষোভ প্রশমন করতে গত মঙ্গলবার থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বরাদ্দ বাড়ানো হয়।
এতে লোডশেডিং কমলেও বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক কারখানায় বিকল্প উপায়ে উৎপাদন করতে গিয়ে বেড়ে যায় ব্যয়।
গত শুক্রবার সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে কারখানায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখনো অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারেনি। এক্সিলারেটের টার্মিনালটি পুরোদমে কবে চালু হবে, নিশ্চয়তা নেই এরও।
জ্বালানি আমদানিতে চ্যালেঞ্জ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যাহত হয়। বিকল্প উপায়ে আমদানি করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তুলনামূলক কম দামে এলএনজি আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়। এতে খোলাবাজার থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে ব্যয় বাড়ে প্রায় দ্বিগুণ।
সরকারের উদ্যোগ: গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছে সরকার। সেই সঙ্গে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার সময় শেষ হবে নভেম্বরে। এ ছাড়া দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পুরনো কূপ সংস্কার এবং স্থলভাগে অনুসন্ধানে বেড়েছে জোর। রয়েছে বাপেক্সের রিগ (খননযন্ত্র) সংখ্যা বাড়িয়ে সাতটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা, জ্বালানি তেলের মজুদ ৬০ দিন করার সিদ্ধান্তও।
পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ছয় মাসে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিবান্ধব বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন এবং সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশে দেওয়া হয়েছে কর ছাড়।
মার্সেন্ট পলিসির (বেসরকারি উদ্যোগ নির্মিত সৌর বিদ্যুৎ অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি) আওতায় চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি অনশোর বায়ুবিদ্যুৎ গাইডলাইনও চূড়ান্ত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ভোলায় অব্যবহৃত গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে একটি বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ও চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।






