শিশুদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ

প্রতীকী ছবি
শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল প্রাণ। তাদের হাসিতে যেমন কোনো হিসাব থাকে না, তেমনি কান্নাতেও থাকে না কোনো ভান। একটি শিশুর মাথায় স্নেহের হাত রেখে তাকে একটু কাছে টেনে নেওয়া কখনো কখনো তার ছোট্ট জীবনে এমন এক নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে, যা বহু বড় উপদেশেও তৈরি হয় না। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের এই কোমল জগতটিকে গভীরভাবে বুঝতেন। তিনি তাদের সঙ্গে এমন মমতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় মিশতেন, যা আজও মানবিক আচরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দুনিয়ার সামনে জ্বল জ্বল করছে।
মহানবী (সা.) শিশুদের শুধু ভালোবাসতেন না, তাদেরও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে বলেও মনে করতেন। তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের অধিকার সম্পর্কে জানে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩; তিরমিজি, হাদিস : ১৯২০)
আনাস (রা.) দীর্ঘ প্রায় দশ বছর মহানবী (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। এত দীর্ঘ সময়ে তাঁর কাছ থেকে কখনো কঠোর ভর্ৎসনা বা বিরক্তির আচরণ পাননি। আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। তিনি আমাকে কখনো “উফ” বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য বলেননি, ‘এটা কেন করলে?’ আর কোনো কাজ না করলে বলেননি, ‘এটা কেন করলে না?’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩১০) এই ঘটনা বড়দের সঙ্গে তাঁর কোমল ব্যবহারের প্রমাণ হলেও এর মধ্যে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে আচরণেরও এক অসাধারণ শিক্ষা রয়েছে।
শিশুদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এতটাই আপন যে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে আসত। তিনি তাদের সালাম দিতেন, কথা বলতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আনসারদের কাছে যেতেন, তাদের শিশুদের সালাম করতেন এবং তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। (নাসাঈ, হাদিস : ৮২৯৪) ভাবুন, তিনি ছিলেন সমগ্র উম্মাহর নেতা, অসংখ্য মানুষের আশ্রয়স্থল; অথচ শিশুদের সামনে তাঁর সেই মহান মর্যাদার কোনো দেয়াল থাকত না।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান ইবন আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। তখন আকরা ইবন হাবিস (রা.) বললেন, ‘আমার দশটি সন্তান, আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭; মুসলিম, হাদিস : ২৩১৮)
নাতিদের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অপার। একবার তিনি নামাজ পড়াচ্ছিলেন। সিজদায় গেলে হাসান অথবা হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে উঠে বসেন। তিনি শিশুটিকে নিজের মতো করে নামতে দেন এবং সিজদা দীর্ঘ করেন। পরে সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আমার পিঠে আরোহণ করেছিল। আমি তাকে তাড়াহুড়ো করে নামাতে চাইনি।’ (নাসাঈ, হাদিস : ১১৪১) নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মধ্যেও শিশুর কোমল অনুভূতির প্রতি তাঁর খেয়াল ছিল। শিশুর পৃথিবী যে বড়দের পৃথিবীর মতো নয়, তিনি তা জানতেন।
আরেকদিন তিনি তাঁর নাতি হাসানকে কোলে নিয়ে চুমু দিচ্ছিলেন। তাঁর সামনে এক ব্যক্তি বলল, ‘আমার তো দশটি সন্তান, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭) এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যে যেন একটি গোটা পরিবারের জন্য শিক্ষা লুকিয়ে আছে: সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। মনের মধ্যে ভালোবাসা রেখে দিলে শিশু তা বুঝবে না; তাকে অনুভব করাতে হয় যে সে প্রিয়।
মহানবী (সা.) শিশুদের অনুভূতির প্রতিও অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। একবার তিনি নামাজে ছিলেন। তখন কোনো শিশুর কান্নার শব্দ শুনে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দেন, যাতে তার মায়ের কষ্ট না হয়। তিনি বলেন, ‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে নামাজে দাঁড়াই; কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে আমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিই।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৭; মুসলিম, হাদিস : ৪৭০) ইবাদতের মধ্যেও একটি শিশুর কান্না তাঁর হৃদয়ে পৌঁছে যেত। তিনি শুধু শিশুটির কান্না শুনতেন না, তার মায়ের অস্থিরতাও অনুভব করতেন।
শিশুদের সঙ্গে তাঁর আচরণে ছিল মর্যাদাবোধও। তিনি তাদের অবহেলা করতেন না, তাদের কথা গুরুত্বহীন মনে করতেন না। একবার সাহাবিরা তাঁর কাছে পানীয় নিয়ে এলে তাঁর ডান পাশে একটি শিশু ছিল এবং বয়োজ্যেষ্ঠ কয়েকজন সাহাবি বাম পাশে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুটির অনুমতি নিয়ে তবেই বয়োজ্যেষ্ঠদের আগে দেওয়ার কথা বলেন। শিশুটি নিজের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি না হলে তিনি তার অধিকারই বজায় রাখেন। (বুখারি, হাদিস : ২৩৫১; মুসলিম, হাদিস : ২০৩০) একটি শিশুকেও তিনি এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা আজকের বড়দের সমাজেও সবসময় দেখা যায় না।
আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো সফর থেকে ফিরতেন, তখন তাঁর পরিবারের শিশুরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে যেত। তিনি তাদের কাউকে সামনে, কাউকে পেছনে বসিয়ে নিতেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৪২৮) শিশুদের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক ছিল আনুষ্ঠানিক নয়, ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক।
মহানবী (সা.)-এর শিশুদের প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্তগুলোর একটি পাওয়া যায় তাঁর নাতি ইবরাহিমের ইন্তেকালের ঘটনায়। শিশুপুত্র ইবরাহিম যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল, তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় দুঃখিত হয়; তবে আমরা এমন কথাই বলব, যা আমাদের রবকে সন্তুষ্ট করে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩০৩; মুসলিম, হাদিস : ২৩১৫) নবী হয়েও তিনি সন্তানের বিচ্ছেদে কেঁদেছেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া দুর্বলতার নাম নয়।
তাই শিশুদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর আচরণ শুধু কিছু সুন্দর ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর শিক্ষা। শিশুকে ভালোবাসতে হয়, তার কথা শুনতে হয়, তার অনুভূতির মূল্য দিতে হয়, ভুল করলে তাকে অপমান না করে শেখাতে হয় এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাকে এই অনুভূতি দেওয়া যে সে ভালোবাসার যোগ্য। মহানবী (সা.) শিশুদের এমনই এক নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিয়েছিলেন, যেখানে নবীর মহত্ত্ব তাদের ভয় দেখাত না, বরং তাঁর স্নেহ তাদের হৃদয় ভরে দিত।
আজকের পৃথিবীতে শিশুদের হাতে আমরা খেলনা তুলে দিই, দামি পোশাক কিনে দিই, ভালো স্কুলে পড়াই; অথচ কখনো কখনো তাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটি দিতে ভুলে যাই, সেটি হলো আমাদের সময়, কোমল কথা এবং নিঃশর্ত স্নেহ। মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, একটি শিশুর হৃদয় জয় করতে বড় কোনো আয়োজন লাগে না; দরকার শুধু একটু ঝুঁকে তার চোখের সমান হওয়া, তার কথা মন দিয়ে শোনা এবং ভালোবাসা দিয়ে তাকে কাছে টেনে নেওয়া।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






