আইনশৃঙ্খলা
মব কমেছে যোগ হয়েছে জঙ্গি আতঙ্ক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো। এ সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেড় বছরের চেয়ে মব ভায়োলেন্সের (দলবদ্ধ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) প্রবণতা কমেছে অনেকটাই। তবে এতেও জনমনে ফেরেনি কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। কারণ, মব নিয়ন্ত্রণে স্বস্তি মিললেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে দিনদুপুরে খুন-ছিনতাইয়ের মতো নৃশংস অপরাধ। এর ওপর জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার তৎপরতার তথ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি আতঙ্ক।
খুন-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খোদ র্যাব-পুলিশ সদস্যরাই হামেশা শিকার হচ্ছেন হামলার। এর বাইরে রয়েছে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো অপরাধও। বালুমহালের দখল ও দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। অথচ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির শীর্ষে ছিল ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করে জনমনে স্বস্তি ফেরানো। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আস্থারসংকট সৃষ্টি হয়েছিল পুলিশে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হলেও দূর হয়নি সেটি। শক্ত মনোবল নিয়ে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ। এমন প্রেক্ষাপটে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের অপরাধের ঘটনা। পুলিশ ও একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।
ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পদক্ষেপ মূল্যায়নে ১০ নম্বরের মধ্যে কত দেবেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবে সরকার স্বাভাবিক করতে পারেনি। ৫ আগস্টের পর অপরাধ ও রাজনীতির যে রূপান্তর ঘটেছে বা পরিবর্তন হয়েছে, সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে পারেনি। এ সুযোগটাই অপরাধী, অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি বা সংগঠনগুলো নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি সরকার করবে না, করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু বাহিনীর মধ্যে এখনো মারাত্মক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বিশেষ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের দূরত্ব কমানো সম্ভব হয়নি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। রাজনৈতিক গ্রুপিং-ট্যাগিং ও হেয় করার কাজ চলছে। এ কারণে বাহিনীর সদস্যরা কাজের চেয়ে তদবিরে বেশি মনোযোগী। কারণ এখানে চাকরি থাকা না থাকার প্রসঙ্গ চলে আসে। ফলে সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। এসব বিষয় বিবেচনা করে আমরা যদি নাম্বারিং করি, তাহলে আমি দশে পাঁচ দেব।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান ঘোষণা ছিল ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ হলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে দূর হয়নি জনমনের অস্বস্তি, বরং বেড়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ নতুন কর্মকৌশল তৈরি করে মাঠে নামলেও তা তেমন কাজে আসছে না।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদের মতে, পুলিশ কোনোভাবেই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এখনো মানুষ রাস্তার মধ্যে ধরে পুলিশকে মারে। রিকশাওয়ালারাও পুলিশকে মারতে আসে, ছাত্ররা মারতে আসে; এটা তো হওয়া উচিত নয়। আমার মনে হয় থানা, জেলা, ডিআইজি অফিসসহ সব ইউনিটে একটা স্ট্রং মেসেজ (শক্ত বার্তা) দিতে হবে, তা হচ্ছে— আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের চাকরি থাকবে না। সরাসরি বাড়ি চলে যেতে হবে। সেটি আইজি, ডিআইজিসহ যেকোনো ইউনিটের সদস্য হতে পারে।’
‘আগেও দলীয় পুলিশ ছিল, এখনো ওইটাই। আগের দলীয় কাঠামো ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। আগে যারা ছিল, প্রতিনিয়ত তাদের চাকরি যাচ্ছে। নতুন যারা আসছে, তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা, কমিটমেন্ট সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে’— যোগ করলেন সাবেক এই পুলিশপ্রধান।
জানা গেছে, অপরাধ দমনে একাধিক বিশেষ অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে বিশেষ টিম। এ ছাড়া সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সাতটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় ও বিএনপি সরকারের শুরু থেকে চলতি বছরের গত ছয় মাসে দেশে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৮৯টি। অর্থাৎ ১৮১ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় ১ হাজার ১৬৯, চুরির ঘটনায় ৬ হাজার ৩৯৯, অপহরণের ঘটনায় ৫১২টি মামলা করা হয়েছে। একই সময়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ আক্রান্তের মামলা করা হয়েছে ৩১৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ১১ হাজার ১৬৫টি। এই পরিসংখ্যান বলছে, বেশ কিছু খাতের অপরাধ ঊর্ধ্বমুখী। তবে পুলিশের এই পরিসংখ্যানই অপরাধের প্রকৃত চিত্র নয়।
বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির (বিসিআরএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ১৪২টি খুন হয়েছে। একই সময়ে ৩৪৭ অপহরণ, ১৮৪ ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ৫ হাজার ৯৯৮টি। জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বলে মনে করছে বিসিআরএস।
এইচআরএসএস প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৩০টি, যা আগের বছরের একই সময়ের (৫২৯টি) তুলনায় অনেক বেশি।
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা গত ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। এ সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৬২১ নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।
এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২৬৮টি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এ সংখ্যা ৮৭০ ছাড়িয়েছে। আসামি গ্রেপ্তার, মাদক ও অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে এমন হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন অবশ্য বললেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘গত ছয় মাসে পুলিশ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি বাড়ানো, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’






