আইয়ুব বাচ্চুর জন্য এলিজি

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে কবির বকুল ও শওকত আলী ইমন
প্রিয় বাচ্চু (আইয়ুব বাচ্চু) ভাই
আপনাকে মিস করি। প্রতি বছর ১৬ আগস্ট দিনটি এলেই ফোনে বা ক্ষুদেবার্তায় ‘শুভ জন্মদিন’ জানাতে পারি না আর। আপনাকে ভীষণ মিস করি। গীতিকবি হিসেবে আমার প্রথম পথ চলা আপনার গাওয়া গান দিয়েই। সেই শুরুটারও আরেক গল্প। আমি মফস্বলের গান পাগল এক ছেলে। কবিতা লিখতাম। শখে গানও লেখার চেষ্টা করতাম এবং চাঁদপুরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতাম। ওই সময় আমার প্রিয় শিল্পীর তালিকায় অন্যতম ছিলেন তপন চৌধুরী। আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন ছিল ‘ইকবাল স্মৃতি সংসদ’। এই সংগঠনের ফান্ড রেইজিংয়ের জন্য আমরা একটা চ্যারিটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। অনুষ্ঠানে গান গাইতে আসেন ওই সময়ের তিন জনপ্রিয় শিল্পী তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ ও সামিনা চৌধুরী। সেই সুবাদে প্রিয় শিল্পী তপন চৌধুরীর সঙ্গে ভীষণ সখ্য হয় আমার। ১৯৮৭ সালে অক্টোবর/নভেম্বরের কোনো একদিন চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসি। প্রিয় শিল্পী তপন চৌধুরীর নয়াটোলা, মধুবাগের বাসায় যাই। সেদিন অনেকটা ভয়ে ভয়ে তপন দার কাছে অপরিপক্ব হাতে লেখা আমার ১৩টি গীতিকবিতা দিই। বলি, আমি লিখেছি, একটু দেখবেন দাদা।
তিনি গানগুলো নিলেন। বাইরে যাওয়ার তাড়া থাকায় আমাকে বললেন, ঠিক আছে, সময় নিয়ে দেখব। তারপর আর কিছুই জানি না। ১৯৮৮ সালে জানতে পারি আমার একটা গান নাকি বাচ্চু ভাই গেয়েছেন। ওই বছরের শেষের দিকে সারগাম থেকে বের হয় আপনার প্রথম একক অ্যালবাম ‘ময়না’। আর এই অ্যালবামে জায়গা পায় আমার লেখা প্রথম গান ‘কাল সারারাত তোমারই কাঁকন যেন কানে কানে রিনিঝিনি বেজেছে, আমাকে ডেকে ডেকে রাত্রির নিশিথে তোমারই ভালোবাসার আবীরে মেখেছে’। পরে জানতে পারি, তপন দা (তখন সোলসে ছিলেন) আমার গানগুলো ব্যান্ডের অন্য সদস্যদের দেখান। সেখান থেকে দুটো গান দুজন নিয়ে নেন। একটি বাচ্চু ভাই। অন্যটি ‘পথে যেতে যেতে খুঁজেছি তোমায়’ নেন নাসিম (নাসিম আলী খান) ভাই। এই গানটি বের হয় ১৯৮৯ সালে। আমার শুরুটা হয়েছিল বাচ্চু ভাই আপনার গাওয়া গান দিয়ে। কিন্তু তখনো আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ১৯৯০ সালে বিজয়নগর সারগাম রেকর্ডিং স্টুডিওতে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আপনি তখন সোলস ছেড়ে লিটল রিভার ব্যান্ড (পরে নাম রাখেন এলআরবি) গড়েছেন। সেই থেকে পেয়েছি আপনার স্নেহ, ভালোবাসা। আপনার সঙ্গে বসে গান লেখার সৌভাগ্য হয় ১৯৯২ সালে। শিল্পী নওশাদ বাবুর (প্রয়াত) জন্য লেখা গানটি ছিল ‘কিছু কিছু কথা আছে, অগোচরে থাকে মনে, কিছু কিছু সুখ আছে রয়ে যায় যে গোপনে’।
মনে পড়ে, আপনি তখন থাকতেন মালিবাগ সার্কুলার রোডের এক বাসায়, ৪র্থ তলায়। ওখানে বসেই এই গানের সৃষ্টি। সেদিন এই গানের শিল্পী নওশাদ বাবুও ছিলেন। আমি লিখলাম, আপনি সুর করলেন। এশিয়া ভয়েস থেকে নওশাদ বাবুর এই অ্যালবাম বেরিয়ে ছিল।
এর পর চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক। আপনি যে গানই গেয়েছেন, সেটাই তুমুল হিট। আমার লেখা অসংখ্য গান প্লেব্যাক করেছেন আপনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– কী দারুণ দেখতে, আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে আমি ছুঁয়েছি তোমায়, আমি দিওয়ানা দিওয়ানা দিওয়ানা, জন্ম জন্মান্তরে, আমরা শুধু দুজন দুজনার, যদি থেমে যায় পৃথিবীর সব কোলাহল’। আমার লেখা আরও গান আপনি প্লেব্যাক করেছেন।
এলআরবির ‘মন চাইলে মন পাবে’ অ্যালবামেও আমার লেখা তিনটি গান ছিল— জন্ম, মৃত্যু, স্বার্থের কাছে বন্দি, আমার প্রথম আমার শেষ–বাংলাদেশ। প্রয়াত কিংবদন্তি সুরকার প্রণব ঘোষের সুরেও সিনেমায় একাধিক গান আপনি গেয়েছিলেন। এর মধ্যে ‘নীরব চিঠি’ উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সচেতনতার গানও করেছেন আপনি। এর মধ্যে ‘মাদককে না বলো’, ‘এসিড’ উল্লেখযোগ্য। প্রথম আলোর ওয়েলকাম সং ‘প্রতিটি মানুষ আলোকিত হোক’, এটিএন বাংলার থিম সংসহ আরও অসংখ্য গান আপনার সুরে লেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই তালিকা অনেক দীর্ঘ।
আপনি চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন আপনার অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি। যার মধ্য দিয়ে আপনি অনন্তকালের রয়ে গেছেন, রয়ে যাবেন— প্রতি দিন সংগীতের প্রতিটি উৎসবে, আনন্দে, কনসার্টে, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, মননে, স্মরণে। আপনি যেখানেই থাকেন, যেন শান্তিতে থাকেন, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এই দোয়া করি।







