পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ নিয়ে ডিজিটাল জালিয়াতি
- ট্রাভেল এজেন্সিতে তৈরি হচ্ছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ
- পুলিশের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইট
- কিউআর কোড স্ক্যান করলে ঢোকা যাচ্ছে নকল ওয়েবসাইটে
- দেখতে হুবহু, বোঝার উপায় নেই আসল নাকি নকল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নকশা, সরকারি মনোগ্রাম, বিভিন্ন দপ্তরের সিল, কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর সব একই। কিউআর কোড স্ক্যান করলে মিলছে ‘বাংলাদেশ পুলিশের’ অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের লিঙ্কও। তবে দেখতে হুবহু নকল ওয়েবসাইট। অবাক করা বিষয়, চট্টগ্রামে ট্রাভেল এজেন্সিতে বসে তৈরি করা হচ্ছে এমন ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ সনদ। লাখ টাকায় বিক্রিও হচ্ছে এসব সনদ। শুধুমাত্র ব্যবহারের সময় মাথায় হাত পড়ে গ্রাহকের। কিন্তু ততক্ষণে সনদদাতা চক্রের সদস্যরা হাওয়া।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ নিয়ে চট্টগ্রামে রীতিমতো জালিয়াতির আসর বসিয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। টার্গেট রাজনৈতিক ও ফৌজদারি মামলার আসামিরা। লেখাপড়া-চাকরির জন্য বিদেশ যেতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ বাধ্যতামূলক। থানায় কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড নেই বলে ওই সনদে প্রত্যয়ন করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে এমন এক জালিয়াত চক্রের ফাঁদে পড়েন বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা নুর হোসেন। একাধিক মামলার আসামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মী ছোট ভাইয়ের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ কিনেছিলেন তিনি। ভাইকে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন। নুর হোসেন দ্বারস্থ হন পুলিশ সুপারের। মামলা করেন বাঁশখালী থানায়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ গতকাল রবিবার রাতে চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এরা হলেন, আশরাফ আলী খান (৩৬), মোহাম্মদ নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন (৪৮) এবং আব্দুর রহমান (৪৬)।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রথমবারের মতো একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আমরা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ডিজিটাল জালিয়াতির তথ্য পেলাম। যে সনদটা দেওয়া হচ্ছে সেটা পুলিশের সনদের একেবারে হুবহু। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম, কিউআর কোড, স্ক্যান পদ্ধতি সবই হুবুহু এক। স্ক্যান করলে পুলিশের ওয়েবসাইটের মতোই একটি নকল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছে। যে সনদটা দেওয়া হচ্ছে সেটার কাগজ এবং সরকারিভাবে সরবরাহ করা কাগজও প্রায় একই।’
একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান ও তার ভাই আব্দুল হাকিমের জালিয়াতির ফাঁদে পড়েন ভুক্তভোগী নুর হোসেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল হাকিমের বাঁশখালী পৌরসভায় হাকিম ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আব্দুর রহমানও আগে ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করতেন। নুর হোসেনের ছোট ভাই জাগের হোসেন (২৪) পেশায় গাড়িচালক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অপারেশন ডেভিল হান্টের সময় দুই ‘রাজনৈতিক’ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ছয়মাস কারাভোগ করেন। এরপর ঝামেলা এড়াতে নুর হোসেন কুয়েতের একটি ভিসা সংগ্রহ করে ছোট ভাইকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
নুর হোসেন জানালেন, ‘ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য হাকিম ট্রাভেলসে যাই। মামলা থাকায় জাগেরের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছিলাম না। আব্দুল হাকিম এটা জানতে পেরে তার ভাই আব্দুর রহমান তার পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট জোগাড় করে দিতে পারবেন বলে জানান। দাবি অনুযায়ী ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আমি তাকে দিই। ১২ আগস্ট আমাকে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। পরদিন আমি বিমানের টিকিটের জন্য শহরের চকবাজারে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে সার্টিফিকেটটা জমা দিলাম। তারা পরীক্ষা করে জানাল সেটি নকল।’
বিষয়টি জানানোর জন্য তিনি হাকিম ট্রাভেলসে গেলে তারা সবকিছু অস্বীকার করেন এবং একদিন পর প্রতিষ্ঠানে তালা দিয়ে গা ঢাকা দেন বলে জানালেন নুর হোসেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা বললেন, আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তার তথ্যে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংঘবদ্ধ এ জালিয়াতি চক্রের আরও কয়েকজন সদস্যের নাম তারা জানতে পেরেছেন। পুলিশের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইটটি কারা তৈরি করেছে এবং কীভাবে কারা পরিচালনা করছে সেটা তদন্তে নেমেছে ডিবি।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বললেন, ‘আগেও নকল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দেশের বিভিন্নস্থানে উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু নকল ওয়েবসাইটের বিষয়টি নতুন। এটা একটা ভয়াবহ জালিয়াতি ও গুরুতর অপরাধ। এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সরকারি নথির কোনো বিশ্বাসযোগ্যতাই থাকবে না।’






