সম্পাদকীয়
একেই বলে হরিলুট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যাংক খাতে খেলাপিদের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দেওয়ার এক অনভিপ্রেত রূপরেখা দৃশ্যমান হচ্ছে। এখানে ১ হাজার কোটি টাকার ঋণের খেলাপ করতে পারলেই মিলছে অভূতপূর্ব শিথিলতা। অপরাধের মাত্রা যত গুরু, পুরস্কৃত হওয়ার সুযোগও যেন তত বিস্তৃত। খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ বছরের দীর্ঘ সময়সীমা, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই বছরের নিশ্চিন্ত গ্রেস পিরিয়ড। নামমাত্র অর্থ পরিশোধ করেই অনায়াসে ঘুচিয়ে ফেলা যাচ্ছে খেলাপির তকমা; একই সঙ্গে উন্মুক্ত হচ্ছে নতুন ঋণ গ্রহণের দ্বার। এতে ঋণ আদায়ের পথ সুগম হওয়া তো দূরের কথা; বরং বড় খেলাপি হওয়ার এক আশঙ্কাজনক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নমনীয় অবস্থান মূলত খেলাপির সংখ্যা ও পরিমাণ বাড়িয়ে তোলার স্থায়ী ব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের যুক্তি, ব্যবসা সচল রাখার জন্য এটি জরুরি। অথচ বাস্তবতা একদম উল্টো। ভালো আর সৎ গ্রাহকরা এখন নিজেদের বোকা ভাবছেন। তারা দেখছেন নিয়মিত কিস্তি দিলে কোনো লাভ নেই। বরং ঋণ পরিশোধ না করে হাজার কোটি টাকা আটকে রাখলেই মিলছে অফুরন্ত সুবিধা। ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়াই এখন দেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। খেলাপির এই দুষ্ট সংস্কৃতিকে লালন করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। ক্ষমতার পালাবদল হয়; কিন্তু খেলাপিদের ভাগ্য বদলায় না। কোনো সরকার তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারে না।
বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কাগজ-কলমে যা দেখানো হয়, আসল চিত্র তার চেয়েও ভয়াবহ। প্রায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী পড়ে রয়েছে। নানা অজুহাতে ও সার্কুলারের আড়ালে আসল সত্য লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেন খেলাপ আড়ালের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? একের পর এক নিয়ম শিথিল করে ঋণের নামকাওয়াস্তে পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের টাকা ব্যাংকে আর ফিরছে না।
জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের অজুহাত দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তো এ সুবিধা পান না। হাজার কোটি টাকার মালিকরাই সব ছাড়ের মূল দাবিদার। তাদের নতুন ঋণ দিয়ে আবারও ব্যাংকের সীমিত সম্পদ এক জায়গায় বন্দি করা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট নৈতিক ঝুঁকি। দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাংকে তাদের কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখছেন। আর ব্যাংক সেই টাকা তুলে দিচ্ছে চিহ্নিত ঋণখেলাপিদের হাতে। এটি সাধারণ মানুষের আমানতের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ব্যাংকগুলো আজ আদায়ের বদলে ছাড় দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা পুরো অর্থনীতিকে আইসিইউতে পাঠানোর জোগাড় করেছে।
আইনের তোয়াক্কা না করে যখন বড় খেলাপিদের একের পর এক অন্যায্য সুবিধা দেওয়া হয়, তখন পুরো আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। সংসদে কঠোর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের শত বুলি ওড়ানো হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ঠিক তার উল্টো চিত্র। বিচারে সোপর্দ করা তো দূরে থাক, তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধার লালগালিচা বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবস্থা এভাবে চলতে থাকলে দেশের গোটা ব্যাংক খাত শিগগিরই সম্পূর্ণ ধসে পড়বে। তখন সব দায় ও খেসারত এসে পড়বে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণের ওপর। খেলাপিদের তোষণ করার এই আত্মঘাতী খেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। হাজার কোটি টাকার খেলাপিদের অবৈধ সুবিধা না দিয়ে কঠোর আইনের আওতায় আনার কথাও ক্লিশে হয়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা অবিলম্বে উদ্ধার না করা গেলে এই হরিলুটের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।





