শ্রেষ্ঠত্বের ‘ভার’ ও লুটের পাথর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
পুলিশ সুপার, সিলেট জেলা
জনাব, শ্রদ্ধা জানবেন। আমি শাহ আরেফিন টিলার এক হতভাগ্য বাসিন্দা ছিলাম। আড়াই দশক আগে আমাদের মাথা উঁচু ছিল। আমরা প্রকৃতির বুকে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলাম। তারপর একদিন আমাদের ওপর কুনজর পড়ল। মানুষ আমাদের কেটে নিয়ে যেতে লাগল। আমরা সরকারি খাস খতিয়ানের সম্পত্তি। তাই প্রশাসন কর্তৃক আমাদের পাহারা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রক্ষকই ভক্ষক হলে যা হয়! আমাদের বুক চিরে নির্মম লুটপাট চলল। আমরা দিনে দিনে নিঃশেষ হয়ে গেলাম। অনিন্দ্যসুন্দর টিলাটি এখন কঙ্কালসার।
গত ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ে। আপনাদের কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সাহেব ‘শ্রেষ্ঠ ওসির’ খেতাব ও পদক পেলেন। আমরা টিলার পাথররা খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, শ্রেষ্ঠ মানুষের ছায়ায় এবার আমরা নিরাপদ। কিন্তু আমাদের সরলতা ছিল বোকামি। আমরা বুঝিনি, শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞা এত বিচিত্র হতে পারে! জানা গেল, ওসির বিশেষ ‘লাইনে’ প্রতি ট্রলি থেকে মাত্র ২০০ টাকা চাঁদার বিনিময়ে আমরা ভোলাগঞ্জে পাচার হয়ে গেলাম। পুলিশ আমাদের পাহারা দিল। যেন আমরা কোনো মহামূল্যবান রাষ্ট্রীয় অতিথি!
কঙ্কালসার টিলার শেষ প্রতিনিধি হিসেবে ওসির গলায় লটকে থাকাটাই হবে আমার একমাত্র পরম প্রাপ্তি
জুলাই মাসে এসে সেই শ্রেষ্ঠ ওসি সাহেবকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার পাওয়া ওই ‘শ্রেষ্ঠ ওসির’ চকচকে পদকটির কী হবে? সেটি তো আর প্রত্যাহার হয়নি! তদন্ত কমিটি গঠন হবে শুনলাম। প্রতিবেদন আসবে। কিন্তু আমরা যারা হারিয়ে গেছি, তারা কি আর ফিরব?
হে হাকিম, ওসির লাইনে পড়ে আমি আমার আদি ঠিকানা হারিয়েছি। এখন আমি ঘরছাড়া, পরিচয়হীন। তাই আপনার কাছে আমার এক আকুতি। আমি তো আর টিলায় ফিরতে পারব না। এর চেয়ে বরং আমাকে ওই ‘শ্রেষ্ঠ ওসি’ সাহেবের পদক হিসেবে ঘোষণা করা হোক। আমি পদক হয়ে ওসির গলায় লটকে থাকতে চাই। যে বুকের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি আমাদের বিলুপ্তির লাইনম্যান সেজেছিলেন, সেই বুকেই আমি অনন্তকাল ঝুলে থাকতে চাই। তিনি যেখানেই বদলি হোন, পুলিশ লাইনে কিংবা অন্য কোথাও, এই পাথরের মেডেল যেন তার গলা থেকে না নামে।
লোভের বাজারে আমাদের জীবনের মূল্য ছিল মাত্র ২০০ টাকা। এবার না হয় ওসির গলার পাথরের ফাঁসি হয়েই আমি ঝুলে থাকি। কঙ্কালসার টিলার শেষ প্রতিনিধি হিসেবে ওসির গলায় লটকে থাকাটাই হবে আমার একমাত্র পরম প্রাপ্তি।
ইতি
ঠিকানা হারানো এক টুকরো পাথর




