পোশাকশিল্প এখন আইসিইউর রোগী

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু বর্তমানে এই খাতটি এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা বিগত চার দশকেও আমরা দেখিনি। দীর্ঘ সময় ধরে এই সেক্টরটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতৃত্ব দিলেও আজ এটি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। আমাদের পোশাকশিল্প আজ যেন আইসিইউতে শায়িত একজন মুমূর্ষু রোগীর মতো। সেই রোগীকে যদি সাধারণ প্যারাসিটামল বা সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া হয়, তবে তা সুস্থ হবে না; তার জন্য প্রয়োজন পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা এবং স্পেশাল ট্রিটমেন্ট। ফলে আমাদের পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে হলে গতানুগতিক নীতি দিয়ে আর চলবে না, প্রয়োজন সময়োপযোগী এবং বিশেষ কিছু সাহসী পদক্ষেপ।
বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতির অস্থিরতা। গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক ধাক্কা খেয়েছে। প্রথমে কভিড-১৯ মহামারী আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছিল। আমরা যখন সেই ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছিলাম, তখনই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এরপর যুক্ত হলো ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ট্যারিফের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জটিলতা ও অনিশ্চয়তা, সৃষ্টি হলো জ্বালানি সংকট। এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে এবং আমাদের রপ্তানি আয় ক্রমাগত হ্রাসের দিকে যাচ্ছে। গত আট মাস ধরে আমরা রপ্তানির এই নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করছি। ২০২৬-এর মার্চের শেষ ১০ দিন ঈদের বন্ধের কারণে কিছু রপ্তানি এপ্রিল ২০২৬-এ স্থানান্তরিত হওয়া এবং গত বছরের এপ্রিল ২০২৫-এর প্রথম সপ্তাহ ঈদের বন্ধ থাকার কারণে এ বছরের এপ্রিলের রপ্তানি পরিসংখ্যানে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি বা শিপমেন্টের তথ্যের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
বৈশ্বিক প্রতিকূলতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ম্যানুফ্যাকচারিং কস্ট বা উৎপাদন খরচ এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সময়ের প্রয়োজনে যৌক্তিক হলেও এর ফলে উদ্যোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। অথচ কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংকিংয়ে নানা রকম অসহযোগিতা। এই বহুমুখী ব্যয়ের চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আজ রুগ্ণ বা ‘সিক’ ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ কারখানা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক। কিন্তু চলমান কারখানা যে একটির পর একটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেদিকেও আগে নজর দেওয়া দরকার। বন্ধ কারখানা চালু করার চেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রুগ্ণভাবে চলমান কারখানাগুলোকে ব্যাংক কর্তৃক গলা টিপে হত্যা না করে চলমান রাখা সহজ ও জরুরি।
পোশাক খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বায়ার বা ক্রেতাদের ‘আনইথিক্যাল বায়িং প্র্যাকটিস’। একদিকে আমাদের দেশে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বায়াররা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আইএলও (ILO) শ্রম অধিকার ও শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিয়ে অনেক সোচ্চার হলেও উদ্যোক্তারা যাতে বায়ারদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য (Ethical Price) পায়, সে ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ। বায়াররা সময়মতো পেমেন্ট না দেওয়া বা কখনো কখনো পণ্য নিয়ে পেমেন্ট না দেওয়া কিংবা ডিসকাউন্ট বা এয়ার শিপমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা অর্ডার বাতিল করার মতো কাজও করছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে সাধারণ শ্রমিকের ওপর।
ব্যবসায়ীদের জন্য আরও একটি অন্যতম বড় আতঙ্কের জায়গা হলো কাস্টমস কর্মকর্তাদের হয়রানি। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কাস্টমস কর্তৃক যে পরিমাণ হয়রানির শিকার হন বন্ড অপব্যবহারকারীদের কখনো হয়রানির মধ্যে পড়তে হয় না। বর্তমান ট্যাক্সেশন পলিসি বিনিয়োগ ও ব্যবসার অনুকূলে নেই। এনবিআর নতুন নতুন করদাতা খোঁজার চেয়ে যারা কর নেটের আওতায় আছে, তাদের ওপরই বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা কাস্টমস-ভ্যাট-ট্যাক্স কর্মকর্তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবসাবান্ধব ভূমিকা রাখলেও কখনো কখনো ওইসব কর্মকর্তার কারও কারও স্বেচ্ছারিতা, অসহযোগিতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বন্দরে পণ্য খালাস বা জাহাজীকরণে দীর্ঘ সময় লাগছে, যা আমাদের লিড টাইম কমিয়ে দিচ্ছে, খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে। এক ব্যাংকের মালিক অন্য ব্যাংকের মালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে একে অন্যকে ঋণ দেওয়া-নেওয়া করে সেই টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এই টাকাগুলো এখন আর ব্যাংকিং সিস্টেমে নেই, যার ফলে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে গিয়ে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ উদ্যোক্তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যাংকগুলো থেকে প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তা পাচ্ছেন না বা নিতে পারছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু ভুল নীতির কারণেও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আজ বন্ধের পথে। চলমান ফ্যাক্টরিগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য যে তারল্য সহায়তা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে না পারলে বেকারত্ব এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া ফ্যাক্টরিগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চালুর চেয়ে বর্তমানে সচল থাকা কারখানাগুলোকে বন্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করা অনেক বেশি সহজ এবং সাশ্রয়ী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংকিং অসহযোগিতার কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক বড় শিল্পকারখানা। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, বরং নীতিগত অসহযোগিতাও দায়ী। কোনো কারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে সেখানকার দক্ষ শ্রমিক ও বাজার পুনরায় ফিরে পাওয়া কঠিন ।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ বা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন আমাদের জন্য সম্মানের বিষয় হলেও এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০১৮ সালে যখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কভিড ও যুদ্ধ-পরবর্তী বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সক্ষমতা অনেক কমেছে। এই রুগ্ণ অর্থনীতি নিয়ে ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করতে যাওয়াটা ছিল অনেকটা ‘ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা’ করার মতো। বর্তমান সরকার অবশ্য এই সময়সীমা পেছানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তা সফল হলে এটা হবে আমাদের পোশাকশিল্পের জন্য এক বড় স্বস্তি। আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো মানে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও কমে যাওয়া।
আমাদের উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সহনশীল। গত ৪৬ বছরে আমরা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড কিংবা কভিডের মতো বড় বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে আছি। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সময়োপযোগী বাস্তবমুখী নীতিগত সহায়তা, নমনীয়তা এবং শক্তিশালী সমর্থন।
এ ছাড়াও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে বিশেষ কিছু করণীয় আছে। প্রথমত নীতিগত সহায়তা : ২০২৬ এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত শিল্প টিকিয়ে রাখতে বিশেষ আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন। যেসব চলমান কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে সেগুলো বাঁচাতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। সেগুলো হলো-
ব্যাংকিং সংস্কার: ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
হয়রানি বন্ধ : এনবিআর ও কাস্টমসের অযৌক্তিক হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসা সহজ করতে হবে। ইউটিলিটি সাপোর্ট : পোশাক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতা : বায়াররা যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য দেয়, সেজন্য সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনা বাড়াতে হবে।
মনে রাখা দরকার, পোশাকশিল্প শুধু মালিকদের সম্পদ নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডকে সোজা রাখতে হলে সরকার, ব্যাংক এবং উদ্যোক্তাদের একযোগে কাজ করতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক ট্রিটমেন্ট পেলে এই শিল্প আইসিইউ থেকে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে।
লেখক: সভাপতি, বিকেএমইএ এবং ইএবি





