ভারসাম্য টলে গেলেই বিপদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এমনিতেই বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন অর্থবছর শুরু হলো এক আশ্চর্য দোলাচল নিয়ে। একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষণশীল মুদ্রানীতি, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির চাকাকে সচল করার সরকারি প্রয়াস। দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অথচ একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে অর্থ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অবস্থান যেন এক দড়ির ওপর হাঁটার মতো। অনেকটা ভার রক্ষার দণ্ড হাতে ট্র্যাপিজের দড়ি পার হতে চাওয়া— ভারসাম্য টলে গেলেই অতল। তারা মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে চায়, আবার বিনিয়োগের জোগানও বাড়াতে চায়। এই দুই আপাতবিরোধী লক্ষ্যের মেলবন্ধন ঘটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবসায়ী মহল অবশ্য এই মুদ্রানীতিতে কিছুটা আশাহত। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স মনে করছে, সংকোচনমূলক নীতির কারণে বাজেটের কর ও শুল্ক সুবিধার সুফল মার খেতে পারে। ঋণের উচ্চ ব্যয়ের কারণে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থনীতির দর্শন বলে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বাজারের অস্থিরতা দূর করা যায় না। বর্তমান মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদার আধিক্য থেকে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারের অদক্ষতা। এই গভীর ক্ষতকে আড়াল করে শুধু মুদ্রার জোগান নিয়ন্ত্রণ করলে আসল সমস্যার সমাধান মেলে না।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো বিমূর্ত বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে না; এটি সরাসরি আঘাত হানে পানির মাধ্যমে। এটি উপকূলের মাটির নিচের নোনাপানি কিংবা চরাঞ্চলের এক ফোঁটা সুপেয় পানির তীব্র তৃষ্ণা হয়ে মানুষের সামনে দাঁড়ায়
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকার নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি। কিন্তু এই যাত্রাপথ মসৃণ নয়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেড় শতাধিক বাধা। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারের দক্ষতার অভাব বারবার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিকল্পনা নেওয়া সহজ; কিন্তু তা বাস্তবে রূপ দেওয়া এক কঠিন সাধনা। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে রাষ্ট্রের অর্থ শুধু অপচয়ই হয় না, জনমানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ণ হয়। জবাবদিহি ও নিয়মানুবর্তিতা ছাড়া এ অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচে কিছুটা রুপালি রেখা দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারে। মন্দা ও আস্থার সংকটে থাকা পুঁজিবাজারকে টেনে তুলতে সরকার একগুচ্ছ কর-প্রণোদনা দিয়েছে। জিরো-কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা এবং লভ্যাংশ কর কমানোর মতো সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক। তবে প্রণোদনাই শেষ কথা নয়। বাজারের স্থায়ী সুফল নির্ভর করছে সামগ্রিক পরিবেশ ও সুশাসনের ওপর। বিনিয়োগকারীদের মনে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই হবে আসল পরীক্ষা। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী আলো ছড়াতে পারে না।
অর্থনীতি শুধু সংখ্যা বা হিসাবের খতিয়ান নয়। এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার স্পন্দন। রাজনীতির নির্যাস হলো মানুষের অর্থনৈতিক জীবন। বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন চারদিকে ছিল নানামুখী চাপ। সে চাপ সামলে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। বিশ্ব অর্থনীতির ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানির অনিশ্চয়তা আমাদের সীমানায়ও ছায়া ফেলছে। এ কঠিন সময়ে প্রয়োজন নীতিমালার স্পষ্টতা ও সব সংস্থার সমন্বিত প্রয়াস। ঋণের বোঝা ও খেলাপি সংস্কৃতির অন্ধকার দূর করতে না পারলে অগ্রগতির পথ রুদ্ধই থাকবে। সংকটের আবর্তে দাঁড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের সাহসী বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। সব বাধা পেরিয়ে অর্থনীতি আবার তার নিজস্ব গতি ফিরে পাক, এটিই প্রত্যাশা। বাজেটে বা মুদ্রানীতির ঘোষণায় যা-ই থাক না কেন, দিনশেষে মানুষ খেয়ে-পরে বাঁচার নিশ্চয়তা চায়।




