আরশোলাদের ক্ষোভে বিস্ফোরণের ইঙ্গিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট হীরক রাজার দেশে অবাধ্য মানুষকে পোষ মানাতে ‘যন্তর মন্তর’ ঘরে ঢুকিয়ে মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করত রাষ্ট্র। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হতো ‘যায় যদি যাক প্রাণ/ হীরকের রাজা ভগবান’। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রের নাম যন্তর মন্তর। পনেরো বছর আগে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে অনশন করেছিলেন আন্না হাজারে। মাঝের সময়টা জুড়েও নানা কিসিমের আন্দোলন দেখেছে মহারাজা জয় সিংয়ের এই ঐতিহাসিক নির্মাণ। ফের সেখান থেকেই বর্তমান বিজেপি সরকারের দড়ি ধরে টান দেওয়ার চেষ্টা হলো ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে। জড়ো হলেন সোনম ওয়াংচুকের মতো সমাজকর্মী, বামপন্থী ছাত্রছাত্রী সংগঠনের নেতৃত্ব। তাদের আন্দোলনে মোদি সরকারের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে।
গত ২০ জুন, সংসদের বর্ষা অধিবেশনের প্রথম দিনে, সিজেপির ডাকা সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তাল হলো দিল্লি। নিট-কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এক মাস ধরে যন্তর মন্তরে চলতে থাকা অনশন আন্দোলনের মঞ্চ থেকেই অভিযানের ডাক দিয়েছিল সিজেপি।
গোটা দিল্লি ডিস্ট্রিক্টে ১৬৩ ধারা জারি করে নিষিদ্ধ করা হয় সব ধরনের মিছিল ও জমায়েত। জায়গায় জায়গায় আটকে দেওয়া হয় বাস ও মেট্রো। তা সত্ত্বেও ভোরবেলা থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-যুব জড়ো হতে থাকেন যন্তর মন্তরে। যারা পৌঁছতে পারেননি, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট ছোট দল বেঁধে এগোতে থাকেন সংসদ ভবনের দিকে। এই নেতৃত্ববিহীন জনস্রোতকে আটকাতে বিভিন্ন জায়গায় লাঠিচার্জ করে পুলিশ, কাঁদানে গ্যাসের শেল মারে।
অভিযোগ, অনেক জায়গায় মাথা লক্ষ্য করে লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। কোথাও সাধারণ পোশাকে থাকা লোকজনকে পুলিশের লাঠি নিয়ে আন্দোলনকারী জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে। অজস্র ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে একজন যুবককে মারছে পুলিশ। তিনি পিছিয়ে যাচ্ছেন না। বরং পুলিশের চোখে চোখ রেখে মরিয়া যুবক চিৎকার করছিলেন, ‘মারো, কত মারবে, মারো।’ কপাল ফেটে রক্ত পড়তে থাকা অবস্থায় পুলিশের দিকে আঙুল তুলে মনে করিয়ে দেন একজন, ‘আমরাই মালিক।’ কাঁদো কাঁদো মুখে সদ্য তরুণী একজন বললেন, ‘ভেবেছিলাম ইউপিএসসি পরীক্ষা দেব কিন্তু পাস করলেইবা এদের সঙ্গে কাজ করব কী করে? এরা এমন অমানুষ!’ শোনা যায় ষোলো বছরের স্কুলড্রেস পরা মেয়ের হাহাকার, ‘একদিন যদি আমিও নিট পরীক্ষা দিই আর আমাকেও আত্মহত্যা করতে হয়?’
এ আন্দোলনের সঙ্গে অনেকেই আন্না হাজারের আন্দোলনের তুলনা করছেন। বেশ কিছু সাদৃশ্যের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে দুটি আন্দোলনের
পুলিশের লাঠিচার্জের বর্ণনা দিতে গিয়ে সহমর্মী জনৈক সাংবাদিক ‘ছত্রভঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। পাশ থেকে তাকে সংশোধন করে দিয়ে যান জনৈক তরুণ, ‘কেন ছত্রভঙ্গ হলো, অর্থাৎ কারা কীভাবে ছত্রভঙ্গ করে দিল, এটা না বললে যে পুরো কথাটা বলা হচ্ছে না! সরি, আই হ্যাড টু কারেক্ট ইউ।’
মাস দুয়েক আগে, ভারতের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির আলটপকা মন্তব্য থেকে জন্ম নেওয়া আরশোলাদের পার্টির ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল সংগত কারণেই। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে নিজেও প্রথমটা তেমন কিছু বলেননি তাদের রাস্তায় নামার পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহের ভেতর তাদের ওয়েবসাইট, এক্স-হ্যান্ডেল এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ওপর কেন্দ্রীয় সরকার এবং কোনো অজানা হ্যাকারের সম্মিলিত আক্রমণই হয়তো দ্রুত তাদের ডিজিটাল মাধ্যম থেকে পথে নেমে আসতে সাহায্য করে। গত ৬ জুন আমেরিকা থেকে দিল্লি আসেন অভিজিৎ দীপকে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং একুশজন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে জমায়েত হয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন তারা।
জন্মের পর মাত্র বিশ দিনের মাথায় এটাই ছিল তাদের প্রথম সংগঠিত অবস্থান। দুই সপ্তাহ ভারতের বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পেইন করেন অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাসেরা এবং ২০ জুন যন্তর মন্তরে দ্বিতীয় দফার কর্মসূচি শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে অবস্থান করবেন বলে জানান তারা। ২৮ জুন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনশন শুরু করেন। তার সঙ্গে অনশন করছিলেন আরও ২০ জন ছাত্রছাত্রী। তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ বামপন্থী ছাত্রছাত্রী সংগঠন ‘আইসা’র নেত্রী নেহা।
জনসমর্থন বাড়ছিল প্রতিবাদীদের। কিন্তু সরকারের দিক থেকে ব্যাপক অর্থে অবহেলিতই ছিলেন অনশনকারীরা। সরকারের তাঁবেদারি করা গণমাধ্যমের ফুরসত ছিল না এ দিকে মনোযোগ দেওয়ার। বিজেপিবিরোধী স্বাধীন সাংবাদিকরা অবশ্যই বারবার করে তুলে ধরেছেন যন্তর মন্তরের দৃশ্য। তারপরও যন্তর মন্তরের জমায়েত দুইশ-চারশতে সীমিত থেকেছে। শুধু জল খেয়ে অনড় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ফলে সোনম, নেহাসহ অনশনকারীদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে।
১৮ জুলাই জোর করে সোনমকে অনশন মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সাফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করে দেয় পুলিশ। এ ঘটনার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। দেশের বিভিন্ন শহরে ছাত্রছাত্রীরা সরব হন সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে। দিল্লির অনশনমঞ্চে উপস্থিত হন শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ প্রমুখ। আন্দোলনকারীদের অনশন ভাঙতে অনুরোধ করেন শাবানা।
২০ জুলাই সিজেপি নেতৃত্বের একাংশকে ডেকে কথা বলেন জে পি নাড্ডা। সোনম ওয়াংচুকের অবিলম্বে মুক্তি এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি নিট কেলেঙ্কারির ফলে আত্মহত্যা করা প্রতিটি ছেলেমেয়ের পরিবারের জন্য কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন সিজেপির প্রতিনিধিরা। অনশন অবস্থান তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে, তাদের দাবি বিবেচনা করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন জে পি নাড্ডা।
সোনম কিন্তু এখনো নাছোড়। অনশনরত আন্দোলনকারীদের ওপর বর্বর পুলিশি আক্রমণের নিন্দা করে তিনি জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ছাত্র-যুবদের দাবি সংসদে তোলা না হচ্ছে অথবা সংসদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সাফদারজং হাসপাতালে এসে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করে এ ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অনশন জারি রাখবেন।
জে পি নাড্ডার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখার কারণ থাকুক বা না থাকুক, আশার কথা আপাতত এই যে দিনের শেষে আন্দোলনকারীরা ফিরে গিয়েছেন যন্তর মন্তরে। অনশনরত আন্দোলনকারীরা অনশন ভেঙে পুলিশি হামলার চিহ্ন বহন করা যন্তর মন্তরে অপেক্ষা করছেন সোনম ওয়াংচুকের জন্য। অথবা, পুনরায় আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সিজেপির শুরুর লগ্নে দীপকে বলেছিলেন, নেপাল বা বাংলাদেশের জেন-জির পথ অনুসরণ করবে না ভারতের মতো পরিণত গণতন্ত্রের ছাত্র-যুবরা। নিজের সেই বক্তব্যকে দীপকে আজকে কীভাবে ফিরে দেখবেন জানা নেই। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আজকের ব্যাপক পুলিশি বর্বরতার জবাবেও কোথাও ছাত্র-জনতার দিক থেকে কোনো পাল্টা হিংস্রতার খবর নেই। এ প্রবল দাম্ভিক ও সহমর্মিতাহীন রাষ্ট্রের সামনে তাদের এ অহিংস দার্ঢ্য কতক্ষণ বজায় রাখা সম্ভব হবে, তা সময় বলবে। এখনকার মত, এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত শক্তিকে অভিনন্দন জানানো ছাড়া দ্বিতীয় করণীয় নেই।
এ আন্দোলনের সঙ্গে অনেকেই আন্না হাজারের আন্দোলনের তুলনা করছেন। বেশ কিছু সাদৃশ্যের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে দুটি আন্দোলনের। আন্নার অনশন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার বিপুল সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু আরশোলাদের লড়াইকে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার বড় অংশই ‘দেশদ্রোহী’দের আন্দোলন বলে চিহ্নিত করছে। তাদের ‘চীনের দালাল’ এবং ‘ডিপস্টেটের এজেন্ট’ বলা হচ্ছে। এমনকি শহীদ ভগৎ সিংয়ের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি কেন সিজেপির মঞ্চ থেকে দেওয়া হচ্ছে সেই অদ্ভুত প্রশ্নও করছে ‘গোদি মিডিয়া’। অন্যদিকে, এ আন্দোলনের কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন নেহাসহ বামপন্থীরা। আন্নার আন্দোলনের সময় তারা কেন্দ্রে ছিলেন না।
২০ জুলাইয়ের পর দিল্লির আন্দোলন সিজেপি বা ব্যক্তি সোনম ওয়াংচুকের চেয়ে অনেকখানি বড় হয়ে গিয়েছে। এ লড়াই আর কোনো দল বা ব্যক্তির লড়াই নয়। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় যুব-জনতার লড়াই। এটিই চলমান আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তির জায়গা। আরশোলাদের আন্দোলন যদি স্তিমিতও হয়ে যায়, আগামীতে এ ক্ষোভ বিস্ফোরণের চেহারা নিতে পারে। প্রয়োজন শুধু সঠিক রাজনৈতিক দিশা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রতিষ্ঠাতা ‘দ্য হ্যামার’





