সারের পর ডিজেল, কৃষকের ওপর দ্বিমুখী চাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে সম্প্রতি দুই দফায় ডিজেলের দাম যেভাবে একলাফে প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, তা আমাদের সামগ্রিক কৃষি খাতের ওপর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো এখন আর সনাতন জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই; বরং তা বহুলাংশে জ্বালানি ও সেচনির্ভর হয়ে পড়েছে। আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হচ্ছে ধান উৎপাদন, যার বিশাল একটি অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। এই বোরো ধানের প্রায় ৮০ শতাংশই সেচনির্ভর। বাংলাদেশে প্রায় ১৪ লাখ সেচপাম্প রয়েছে, যার মধ্যে ১২ লাখই ডিজেলচালিত। এক বিঘা জমিতে বোরো চাষ করতে হলে মৌসুমে অন্তত সাত থেকে আটবার সেচ দিতে হয়, যেখানে প্রায় ৫০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন পড়ে। এতদিন কৃষকের মোট উৎপাদন খরচের ২২ থেকে ২৩ শতাংশ শুধু সেচের পেছনেই চলে যেত। এখন তেলের দাম এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সেচব্যবস্থার পাশাপাশি জমি চাষে ব্যবহৃত পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর কিংবা আধুনিক ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন চালানোর খরচও বহু গুণ বেড়ে গেছে। সামগ্রিক হিসাব করলে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতি বিঘা জমিতে একজন কৃষকের অন্তত ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।
এই অতিরিক্ত খরচের ভার সবচেয়ে বেশি চেপে বসবে প্রান্তিক কৃষকের ওপর। অর্থনীতির সাধারণ নীতি অনুযায়ী, আমাদের দেশের কৃষকরা হচ্ছেন ‘প্রাইস টেকার’, অর্থাৎ তারা পণ্যের দাম গ্রহণে বাধ্য; তারা দাম নির্ধারণকারী নন। বাজারের বড় বড় সিন্ডিকেট কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীরাই পণ্যের দর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে ফসল ফলানোর খরচ বহুগুণ বেড়ে গেলেও বাজারে গিয়ে সেই বাড়তি খরচের সমপরিমাণ দাম কৃষক পান না। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটাই তাদের জন্য এক অসহনীয় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকের জন্য পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে মাঠে চলমান সার সংকটের কারণে। একদিকে তেলের দামের উত্তাপ, অন্যদিকে পর্যাপ্ত সারের অভাব— এ দুই মিলে কৃষকের ওপর যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পড়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সার মজুদের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষককে সার না পেয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন করতে হচ্ছে। এমনকি সরকারি ডিলারদের হাত ঘুরে সেই সার সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার হয়ে যাওয়ার খবরও গণমাধ্যমে আসছে। কৃষি উৎপাদনের এ দুটি প্রধান হাতিয়ার সার ও ডিজেল— উভয় খাতেই একযোগে জটিলতা তৈরি হওয়া দেশের কৃষিব্যবস্থার জন্য এক বিরাট ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে।
একদিকে তেলের দামের উত্তাপ, অন্যদিকে পর্যাপ্ত সারের অভাব— এ দুই মিলে কৃষকের ওপর যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পড়েছে। কৃষি উৎপাদনের এ দুটি প্রধান হাতিয়ার সার ও ডিজেল— উভয় খাতেই একযোগে জটিলতা তৈরি হওয়া দেশের কৃষিব্যবস্থার জন্য এক বিরাট ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে
একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বিশ্ব জুড়ে ‘এল নিনো’র নেতিবাচক প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে খাদ্যপণ্য, ভোজ্য তেল ও জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি সংকট সামাল দিতে বিশ্বের অনেক দেশ খাদ্যশস্যকে বায়ো-ফুয়েল বা জৈব জ্বালানিতে রূপান্তর করার কৌশল বেছে নিয়েছে। ভারতের মতো বড় খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ চিনি দিয়ে ইথানল তৈরি বাড়িয়ে দিয়ে চিনি আমদানি পর্যন্ত করা শুরু করেছে। আবার ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ তাদের স্থানীয় পাম অয়েলকে বায়ো-ডিজেলে রূপান্তর করছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব ভোজ্য তেলের বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার রেশ নিশ্চিতভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে এসে পৌঁছাবে।
পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে দেশের ভেতরে খাদ্যসামগ্রীর দাম হুহু করে বাড়ছে। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামমুখী কৃষিপণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ৬ থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে আটকে আছে। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি এর থেকেও অনেক বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে শহর ও গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষকে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের মোট উপার্জনের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ শুধু খাদ্যের পেছনেই ব্যয় করে থাকে। যখন খাদ্যদ্রব্যের দাম অসংগতিপূর্ণভাবে বেড়ে যায়, তখন তারা বাধ্যতামূলকভাবে খাবারের পরিমাণের সঙ্গে কিংবা গুণগত মানের সঙ্গে আপস করতে শুরু করেন। প্রোটিনজাতীয় খাবার, যেমন— মাছ বা মাংস খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় এবং শুধু ভাত, ডাল ও আলু দিয়ে তাদের দিন চালাতে হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিকে বলা চলে একটি নীরব ঘাতক, যা গ্রামাঞ্চলের অন্তঃসত্ত্বা এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হার আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যথাযথ সামাজিক সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে শুধু এই মূল্যস্ফীতির চাপেই দেশে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ অতিদরিদ্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। আমাদের অর্থনীতিতে শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে পুনরায় কৃষির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। শহর থেকে কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে কৃষি ও গবাদি পশু পালনের মতো খাতে যুক্ত হওয়ার হার বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে এবং কৃষক লোকসানের মুখে পড়লে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোতেই ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এই বহুমুখী সংকট থেকে কৃষি খাত রক্ষা করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ ‘কৃষি বা জ্বালানি কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি ভর্তুকি কিংবা নির্দিষ্ট দামে ডিজেল ও সার পাওয়ার সুব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত দামে এগুলো কিনতে না হয়। দ্বিতীয়ত, রাসায়নিক সারের চোরাচালান ও পাচার রুখতে সীমান্ত এবং ডিলার পয়েন্টগুলোতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তৃতীয়ত, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বা ওএমএস এবং অন্যান্য সামাজিক খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি বহুলাংশে বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সামান্য স্বস্তি পায়। খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়, এর সঙ্গে দেশের স্বনির্ভরতা ও স্থিতিশীলতা জড়িত। আসন্ন বোরো মৌসুমে আমাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে সরকারকে এখনই আগাম প্রস্তুতি ও সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)




