ক্ষমতায়ন না পৃথককরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ১৮ আগস্ট নারীদের জন্য যে বিশেষ ‘পিংক বাস’ বা গোলাপি বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক— এটি কি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন, নাকি জেন্ডারভিত্তিক পৃথককরণ বা সেগ্রিগেশনের আরেকটি রূপ? এসব বিতর্কের গভীরে গিয়ে আমাদের বুঝতে হবে নারীর নিরাপত্তা, সমতা, ন্যায্যতা এবং আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার জটিল সমীকরণটি।
উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো, গণপরিবহনে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা। প্রাথমিকভাবে ১৪টি দিয়ে পিংক বাস সার্ভিস চালু করেছে বিআরটিসি। এর মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে চলছে ১০টি বাস। চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় রয়েছে দুটি করে। বাসগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি যেমন: ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (VTS), সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা এবং সহজে টিকিট কাটার জন্য ই-টিকেটিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এত লোকের শহরে ১৪টি বাস নিতান্তই কম। অনেকে বলছেন, সংখ্যা ব্যাপার নয়, শুরু যে হয়েছে এটিই ভালো।
উন্নয়ন ডিসকোর্সের ভিউ থেকে দেখলে বলা যায়, সরকারের এ উদ্যোগ, কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করবে।
পিংক বাস সার্ভিস শুধু যাতায়াত সেবা নয়; বরং এটি পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করবে। কয়েক দশক ধরে পুরুষপ্রধান এই শিল্পে নারীদের চালক, কন্ডাক্টর ও কর্মী হিসেবে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীকে বাসের চালকের আসনে বসানো এবং টিকিট কাটার কন্ডাক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে তাকে শুধু সেবার গ্রহীতা হিসেবে রাখা হচ্ছে না; বরং একজন দক্ষ কর্মী, উপার্জনকারী এবং পেশাদার চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এটি নারীর নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান এবং পাবলিক স্পেসে নিজের কর্তৃত্ব বাড়াতে অনন্য ভূমিকা পালন করবে।
নারীকে বাসের চালকের আসনে বসানো এবং টিকিট কাটার কন্ডাক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে তাকে শুধু সেবার গ্রহীতা হিসেবে রাখা হচ্ছে না
বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়লেও নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নটি এখনো একটি বড় বাস্তবতা। নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে নিরাপদ চলাচলের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একজন নারী নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে না পারলে, দূরের কর্মস্থলে যাতায়াত করতে না পারলে বা সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাইরে থাকতে না পারলে তার কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
পিংক বাসের আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো, এর সামাজিক প্রভাব। একটি শিশু যখন একজন নারীকে বড় বাসের স্টিয়ারিং হাতে দেখে, তখন তার সামনে নতুন একটি সম্ভাবনার জগৎ তৈরি হয়। নারী শুধু ঘর, স্কুল বা অফিসের নির্দিষ্ট কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত— এ প্রচলিত ধারণা তখন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। দৃশ্যমানতা অনেক সময় সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশের নারীদের জন্য গণপরিবহন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন যাতায়াতের সময় নারীদের হয়রানি, অনিরাপদ পরিবেশ ও অশোভন আচরণের সম্মুখীন হতে হয়। এই অনিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থার প্রভাব শুধু চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সরাসরি নারীর অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আঘাত করে। যাতায়াতের নিরাপত্তা না থাকলে নারীর পৃথিবী শুধু ভৌগোলিকভাবেই ছোট হয় না, তার শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়ে পড়ে। দূরের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ভালো বেতনের চাকরি বাদ দিতে হয়, নাইট শিফট নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় এবং ক্যারিয়ারের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়।
নিরাপদ পরিবহন শুধু যাতায়াতের বিষয় নয়, এটি নারীর শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ রয়েছে; বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রিও ডি জেনিরোতে নারীদের সংরক্ষিত ট্রেনের কামরা ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ মিশ্র কামরার চেয়ে প্রায় অর্ধেক কম হারে শারীরিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা দেওয়ার ফলে তাদের চাকরির আবেদনের হার দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর
আমাদের সমাজে প্রচলিত রক্ষণশীল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রথা অনেক সময়ই নারীকে পর্দার আড়ালে বা গৃহকোণে সরিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু এই রক্ষণশীলতার বিপরীতে নারীকে বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসানো এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি শুধু জেন্ডার সেগ্রিগেশন নয়; কারণ এটি নারীকে আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে না; বরং তাকে সমাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত একটি পেশায় চালকের আসনে বসাচ্ছে। এই ‘দৃশ্যমানতা’ অত্যন্ত জরুরি। একটি মেয়ে যখন প্রতিদিন রাস্তায় নারী চালকদের বাস চালাতে দেখবে, তখন তার নিজস্ব পেশাগত কল্পনাশক্তি বিকশিত হবে। সামাজিক নিয়মগুলো এভাবেই বদলায়— প্রথমে যা অস্বাভাবিক লাগে, তা ধীরে ধীরে পরিচিত হয় এবং একসময় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
তবে ‘পিংক সিলিং’ ট্যাগ পিংক বাসের ক্ষেত্রে একটি বড় আশঙ্কাও রয়েছে। নারী চালকদের যদি শুধু নারী বাসেই সীমাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং সাধারণ বিআরটিসি বাস চালানোর অধিকার না দেওয়া হয়, তবে তা পেশাগত সেগ্রিগেশন ডেকে আনবে। পিংক বাস একটি রূপান্তরকালীন সমাধান বা ‘ব্রিজ’ হতে পারে; কিন্তু এটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। চূড়ান্ত গন্তব্য হলো, এমন একটি সাধারণ পাবলিক স্পেস তৈরি করা, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
সরকারের এ উদ্যোগের চূড়ান্ত সাফল্য মাপা হবে বাসের সংখ্যার ওপর নয়; বরং কতজন নারী পেশাদার চালক হয়ে মূলধারার বিআরটিসি বহরে যোগ দিচ্ছেন, তাদের সমান বেতন ও পদোন্নতি আছে কি না এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা (টয়লেট, ম্যাটারনিটি প্রোটেকশন, চাইল্ডকেয়ার ও হ্যারাসমেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম) নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা দিয়ে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন এক সমাজ গঠন করা, যেখানে পুরো শহরের দিকনির্দেশনা বা স্টিয়ারিং থাকবে নারীর নিজের হাতে। অতীতে নারীদের জন্য নেওয়া অনেক ভালো উদ্যোগ কয়েক মাস পর বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এই ‘পিংক বাস’ সার্ভিস যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার







