মার্কিন দলিলে ৭ নভেম্বর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ কিংবা ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’— যে নামেই স্মরণ করা হোক, ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহের পর বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ ঘটনার মাত্র তিন দিন পর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো এক গোপন কূটনৈতিক টেলিগ্রামে উঠে এসেছে সেনাবাহিনীর ভেতরে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা, কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাহীনতা এবং হত্যাকাণ্ডের বিবরণ।
১৯৭৫ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ‘লাস্ট উইক ইন বাংলাদেশ ইন রেট্রোস্পেক্ট’ শিরোনামে টেলিগ্রামটি পাঠান। এতে ৩ থেকে ১০ নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়া হয়। শুরুতেই বোস্টার লিখেছেন, এক সপ্তাহে বাংলাদেশে তিনটি সরকার এসেছে। প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছে এবং দেশ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সামান্য ব্যবধানে গৃহযুদ্ধ এবং এর সূত্র ধরে ভারতের হস্তক্ষেপ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে দূতাবাস মনে করেছিল।
টেলিগ্রামের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি ৭ নভেম্বরের পরের পরিস্থিতি নিয়ে। বোস্টারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিম্নপদস্থ সৈনিকদের বিদ্রোহ সফল হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে শৃঙ্খলাভঙ্গ শুরু হয়। সৈনিকদের একাংশ এমন কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হতে থাকে, যাদের বিরুদ্ধে তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল। অন্যরা সেনা নেতৃত্বের কাছে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুযোগ-সুবিধা ও আচরণ নিয়ে নানা দাবি জানাতে থাকে।
দূতাবাসের কাছে আসা খবরের বরাত দিয়ে বোস্টার আরও লিখেছেন, সেনানিবাসে সৈনিকদের বেপরোয়া আচরণের ভয়ে বিপুলসংখ্যক সামরিক কর্মকর্তা পালিয়ে গিয়েছিলেন অথবা সেখানে ফিরতে ভয় পাচ্ছিলেন। কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের স্ত্রীদের হত্যার খবরও দূতাবাস পেয়েছিল।
অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এসেছিল, তার পরপরই বাহিনীর ভেতরে স্বাভাবিক কমান্ড ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সৈনিকদের বিদ্রোহ শুধু একটি সামরিক নেতৃত্বকে উৎখাত করেই থামেনি; তার পরিণতিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও কর্তৃত্বের কাঠামোও সংকটে পড়ে।
এক সপ্তাহে তিন সরকার
টেলিগ্রামটির বিবরণ অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংকটের সূচনা। সে সময় খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি। খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীরা দ্রুত ঢাকা সেনানিবাস এবং রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। শক্তি প্রদর্শনের জন্য মিগ যুদ্ধবিমান ও সশস্ত্র হেলিকপ্টারও ওড়ানো হয়।
মোশতাকের কাছে চারটি দাবি পেশ করেন খালেদ মোশাররফ। জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে তাকে সেনাপ্রধান করতে হবে, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী মেজরদের সেনাবাহিনীর নিয়মিত শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে হবে, সরকারের অনুগত ট্যাংক বাহিনীকে নিরস্ত্র করতে হবে এবং মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে দিতে হবে।
টেলিগ্রামে বলা হয়েছে, রক্তপাত এড়াতে মোশতাক শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় রাজি হন। এর ফলে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে যুক্ত মেজররা দেশত্যাগের সুযোগ পান। এ সময় কুমিল্লা সেনানিবাসের বাহিনীকে মোশতাক সরকারের পক্ষে ঢাকায় আসতে বলা হলেও তারা সাড়া দেয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, সেনাপ্রধান অথবা চিফ অব জেনারেল স্টাফের নির্দেশ ছাড়া তারা কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
বোস্টার লিখেছেন, এক সপ্তাহে বাংলাদেশে তিনটি সরকার এসেছে। প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছে এবং দেশ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সামান্য ব্যবধানে গৃহযুদ্ধ এবং এর সূত্র ধরে ভারতের হস্তক্ষেপ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে দূতাবাস মনে করেছিল
এর মধ্যেই ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাক— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। মার্কিন দূতাবাসের মূল্যায়নে, মোশতাক নিহত হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়ে থাকতে পারে। এক বা একাধিক মেজরের নির্দেশে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে দূতাবাসের ধারণা ছিল। তবে খালেদ মোশাররফ এ বিষয়ে আগে থেকে জানতেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি দূতাবাস।
এরপর মঙ্গল ও বুধবার মোশতাক ও খালেদ মোশাররফের মধ্যে আলোচনা চলে। মঙ্গলবার রাতে খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে মোশতাক পদত্যাগ করেন। প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং সংসদ ভেঙে দেন।
কিন্তু খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণ সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তা ও সৈনিকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। দূতাবাসের মূল্যায়ন ছিল, জিয়াউর রহমানের প্রতি সেনাবাহিনীর ভেতরে তুলনামূলক বেশি সমর্থন ছিল। অন্যদিকে, খালেদ মোশাররফকে ভারতীয় নীতির অনুসারী হিসেবে দেখার একটি ধারণা সেনাবাহিনীর ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছিল। জেলহত্যার প্রতিবাদে মুজিবপন্থীদের মিছিল এবং বুধবারের হরতাল সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।
শুক্রবার, ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে নিম্নপদস্থ সৈনিকরা বিদ্রোহ করেন। দ্রুতই খালেদ মোশাররফ ও তার অনুগত বাহিনী পরাস্ত হয়। প্রায় সব সূত্রের বরাত দিয়ে বোস্টার লিখেছেন, খালেদ মোশাররফ নিহত হন। সারা রাত এবং শুক্রবার দিনভর রাজধানীতে গোলাগুলি চলে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের হিসাবে, নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০; অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে এ সংখ্যা কয়েকশ বলা হয়েছিল।
জিয়ার উত্থান, সায়েমের রাষ্ট্রপতিত্ব
খালেদ মোশাররফের পতনের পর ক্ষমতার নতুন কাঠামো নির্ধারণে শুক্রবার সকালে জিয়াউর রহমান, খন্দকার মোশতাক এবং তাদের সহযোগীদের মধ্যে বৈঠক হয় বলে টেলিগ্রামে উল্লেখ করা হয়েছে। মোশতাককে আবারও রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল, তখনকার বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে একজন অরাজনৈতিক ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তার হাতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও দেওয়া হয়। এর আগে অল্প সময়ের জন্য এ দায়িত্ব জিয়ার হাতে ছিল। নতুন এই ব্যবস্থার প্রতি সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে মার্কিন দূতাবাসকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
বোস্টারের মূল্যায়ন ছিল, ১০ নভেম্বর সোমবার নাগাদ পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। রবিবার আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও শুরু হয়েছিল। তবে সামরিক বাহিনীতে হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকা এবং সীমান্তে ভারতের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ তখনো কাটেনি।
ভারতপন্থী তকমা নিয়ে দূতাবাসের সংশয়
১০ নভেম্বরের টেলিগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, খালেদ মোশাররফকে ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে মার্কিন দূতাবাসের সংশয়। বোস্টার লিখেছেন, খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী ছিলেন— এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে ছিল না; বরং তিনি ভারতপন্থী ছিলেন না, এমন কিছু তথ্যও ছিল। তা সত্ত্বেও তাকে ব্যাপকভাবে ভারতীয় নীতির অনুসারী হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
দূতাবাসের মূল্যায়নে, ৩ ও ৭ নভেম্বরের সামরিক পালাবদলের প্রধান অংশগ্রহণকারীদের কর্মকাণ্ড মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। মোশতাক ও ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী মেজরদের উৎখাতের পেছনে সেনাবাহিনীর একাংশের ক্ষোভ কাজ করেছিল। আর ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল নিম্নপদস্থ সৈনিকরা, যারা খালেদ মোশাররফের তুলনায় জিয়াউর রহমানকে বেশি পছন্দ করতেন এবং খালেদ মোশাররফের আনুগত্য কোন দিকে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টেলিগ্রামে বোস্টার স্পষ্টভাবে লিখেছেন, ওই সপ্তাহের কোনো সরকারই ভারতপন্থী, সোভিয়েতপন্থী কিংবা মার্কিনবিরোধী ছিল— এমন বিশ্বাস করার কারণ দূতাবাসের কাছে ছিল না। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ওই সপ্তাহের ঘটনাগুলোর পেছনে ভারতের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণও তারা পায়নি।
এই নথি তাই ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু একটি পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় দেখার সুযোগ দেয় না; বরং একই সপ্তাহে সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নিম্নপদস্থ সৈনিকদের বিদ্রোহ, নেতৃত্বের সংকট, হত্যাকাণ্ড এবং নতুন সরকার গঠনের জটিল ধারাবাহিকতা সামনে আনে।
৭ নভেম্বরকে ‘বিপ্লব ও সংহতি’ হিসেবে স্মরণ করার পাশাপাশি ওই দিনের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে যে বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, তা নিয়েও ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা জরুরি। কারণ, কোনো ঐতিহাসিক দিনের তাৎপর্য বুঝতে হলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; সেই পালাবদলের পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হয়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




