নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র কেউ পছন্দ করে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। গণতান্ত্রিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ভারতের। প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বারবার সামরিক শাসনের মুখোমুখি হলেও স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারত কখনো সামরিক শাসনের মুখোমুখি হয়নি। আজ সেই ভারতেই সংসদীয় গণতন্ত্র ভয়ংকর হুমকির মুখে পড়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতে কখনো কংগ্রেস, কখনো বিজেপি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এবার গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিরোধীদের এমন একটি মাঠে খেলতে বাধ্য করা হচ্ছে, যেখানে রেফারি সম্পূর্ণভাবে শাসকদলের পক্ষে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখলাম, ১০ মাসে ১৪ বার এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার। এক দিনে চারবারও আপত্তি জানানো হয়েছে। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সেই আপত্তিগুলো কোনো গুরুত্ব দেননি।
এসআইআরের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় অংশই মুসলিম। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করেন এমন বহু মানুষের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যারা কারগিলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরও অনেকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাবেক সাংসদের নামও বাদ যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, বিজেপির বিরোধিতা করেন— এমন নাগরিকদের একটি বড় অংশের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগটি। পশ্চিমবঙ্গে আমরা দেখলাম, লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার পর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং সেই নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এলো। ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রে এর চেয়ে ভয়ংকর ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। এটি এক অর্থে ‘নীরব গণহত্যা’। এখানে সরাসরি গুলি চলতে দেখা যায়নি, মানুষকে গলা কেটে মেরে ফেলতে দেখা যায়নি। কিন্তু কোটি কোটি মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে স্রেফ হারিয়ে যেতে দেখা গেছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার চলে গেছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? অবশ্যই নয়। শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, সমস্যাটি ব্যবস্থার। আমাদের যে ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, আগে সেটিকে মেরামত করতে হবে। আর সেই দাবিতেই বামপন্থীরা রাস্তায় নেমেছেন। দিল্লিতে সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা ভোরাসহ অনেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন; আন্দোলন থেকে সমাজকর্মী ও স্বরাজ ইন্ডিয়ার নেতা যোগেন্দ্র যাদব ও নেহা বোরাসহ অনেককে পুলিশ আটকও করেছে। কলকাতায়ও বামপন্থীরা বড় প্রতিবাদ মিছিল করেছে, পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস বড় আন্দোলন করেছে। আপাতদৃষ্টে বিচ্ছিন্ন হলেও আন্দোলন গড়ে উঠছে।
অন্যদিকে, ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছে। আগেই বলেছি, শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগেই সংকটের সমাধান হবে না; পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো যেসব রাজ্যে এসআইআর করে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলা দরকার। একই সঙ্গে এসআইআরের আগে যে ভোটার তালিকা ছিল, সেই তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আগে নতুন করে কোনো নির্বাচন যেন অনুষ্ঠিত না হয়— সেই দাবি তোলা অত্যন্ত জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে এরই মধ্যে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে বিধানসভা উপনির্বাচনের ঘোষণা হয়েছে। কলকাতা, হাওড়াসহ বিভিন্ন পৌরসভার নির্বাচন নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু এসআইআরের মাধ্যমে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করে নির্বাচন করলে একই ফলাফল হবে। বুদ্ধিজীবী অনেকে এরই মধ্যে এ প্রসঙ্গে সোচ্চার হয়েছেন।
সার্বিকভাবে গোটা দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও বিরক্তি তৈরি হয়েছে। তারা কোনোভাবেই চায় না, ভারতবর্ষে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি হোক, যেখানে গণতন্ত্র থাকবে, নির্বাচন থাকবে; কিন্তু সেটি হবে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র
যারা ভোট দেন, তারাই গণতন্ত্রের প্রাণসত্তা। সেই নাগরিকদেরই যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্র বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। মোদি জমানায় ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থাকে যেভাবে ভেতর থেকে একটু একটু করে ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেটি আগে সারিয়ে তুলতে হবে। নির্বাচন কমিশনসহ পুরো ব্যবস্থাকে পক্ষপাতমুক্ত করতে হবে। এই সংস্কার ছাড়া ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের যে গৌরব, সেটি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু বিজেপি সরকার আদৌ এসব সংস্কার হতে দেবে কি না এবং বিরোধীরা কী করে তার চূড়ান্ত মোকাবিলা করবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সংসদীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসক পরিবর্তনের যাবতীয় রাস্তা যদি অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া মানুষের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তবে এটিও সত্য যে, ভারতে হঠাৎ করে গণঅভ্যুত্থান সম্ভব নয়, তবে গণআন্দোলনে সম্ভব। আর মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই গণআন্দোলন চলছে। অতীতে এনআরসি ও সিএএর বিরুদ্ধে দিল্লিতে ঐতিহাসিক গণআন্দোলন হয়েছে। ২০২০ সালে করোনার সময়ও সেই আন্দোলন আমরা দেখেছি। এরপর কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির বুকে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সে আন্দোলনে কৃষকরা জয়লাভ করেছেন। বর্তমানেও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলন থেমে নেই। এটা ঠিক যে, সব আন্দোলন হয়তো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না, কিন্তু মানুষের লড়াই চলছে।
ভারতীয় জনগণের এই লড়াই মূলত ভারতীয় গণতন্ত্রকে রক্ষা করার লড়াই। সমস্যা হচ্ছে, এসব আন্দোলনের প্রতিফলন আমরা ভোটের বাক্সে দেখতে পাচ্ছি না বা পাইনি। কেন দেখতে পাচ্ছি না বা পাইনি? কারণ, ভোট ব্যবস্থাটাকেই কারচুপির মাধ্যমে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার অভিযোগ উঠছে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনটি সেই অভিযোগকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুজন নির্বাচন কমিশনার নিজেরাই নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। আর এ দুই নির্বাচন কমিশনার নিজেরাই মুখ খুলেছেন এই প্রতিবেদনে। সিজেপি নেতা সৌরভ দাস বলেছেন, ওই দুই নির্বাচন কমিশনারের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাদের ঘনিষ্ঠদের বাড়িতে আয়কর দপ্তরের তল্লাশি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যাতে তারা পিছিয়ে যান এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। তবে এখন পর্যন্ত তারা সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি।
ভারত এ মুহূর্তে অত্যন্ত বিপজ্জনক সময় পার করছে। ভারতীয় গণতন্ত্রকে বিজেপি সরকার খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই লড়াই কঠিন। কিন্তু মানুষের লড়াই চলছে। গণআন্দোলন চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতো করে লড়াই করছে ও করবে। মানুষ এতে যুক্ত হবেন। কিন্তু সার্বিকভাবে গোটা দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও বিরক্তি তৈরি হয়েছে। তারা কোনোভাবেই চায় না, ভারতবর্ষে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি হোক, যেখানে গণতন্ত্র থাকবে, নির্বাচন থাকবে; কিন্তু সেটি হবে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। ভারতীয় জনগণ এমন নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আর সে কারণেই এই লড়াই থামবে না; বরং আগামী দিনে এই গণআন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
লেখক: ‘দি ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকার এক্সিকিউটিভ এডিটর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক




