ইতিহাসের কৌতুক

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়টা ঘটনাবহুল। তাই বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, ব্রিটিশের চাতুর্য, বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক জগৎ— এসব বহু ধরনের বিষয় এবং তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বিষয়বস্তুর কারণেই বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করে। আরও উপাদান রয়েছে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো তার অনিবার্য উপস্থিতি ঘটবে।
১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাজনের পেছনকার উদ্দেশ্যটা ছিল হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উৎসাহিত করে ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়া। তবে ওই ঘটনার ইতিবাচক দিকও ছিল। সেগুলোর একটি হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তি সংগ্রহে সহায়তাদান। কিন্তু ইতিহাসের বহুবিধ কৌতুকের একটি বেশ সরবেই এখানে ঘটে গেছে। সেটা এই যে, বাঙালির ওই জাতীয়তাবাদী অনুভূতি টেকসই হয়নি। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দাপট চলে এসেছে। পরিণতি দাঁড়াল প্রশাসনিকভাবে নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবেই বাংলার করুণ বিভাজন, যার দরুন বাংলা আর বাঙালির রইল না, সর্বভারতীয়দের করতলগত হয়ে গেল। এক টুকরো পড়ল হিন্দুস্তানের হাতে, অপর টুকরো চলে গেল পাকিস্তানের দখলে। এ সত্যটা ভুললে চলবে না যে, সাম্প্রদায়িকতা বস্তুটি ব্রিটিশেরই সৃষ্টি; তাদের আগমনের আগে ভারতে সম্প্রদায় ছিল; কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়নি। ধর্মের নামে গৃহযুদ্ধ ঘটেনি।
ইতিহাস যে কৌতুকপ্রিয়, সেটা তো সর্বজনবিদিত। ইংরেজ এসেছিল ব্যবসা করবে বলে। পেয়ে গেল মস্ত বড় একটা সাম্রাজ্য। সেটা একটা কৌতুক বটে। আবার বীরদর্পে আস্ফালন এবং স্থানীয় মানুষদের ওপর জুলুম চালিয়ে, সম্পদ পাচারের ডাকাতি সম্পন্ন করে শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে লেজ গুটিয়েই সে যে প্রস্থান করল, সেটাকেও কৌতুককর বলাটা হয়তো অন্যায্য হবে না। গুজরাটি দুই তরুণ বিলেত গিয়েছিলেন আইন ব্যবসায়ী হওয়ার অভিপ্রায়ে, ফিরে এসে তারা যে ভারতের বিভাজনে অত বড় ভূমিকা রাখবেন, সেটা কে জানত? জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিলেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে, পরিণত হয়েছেন মুসলিম জাতীয়তাবাদীতে। গান্ধী ঘোষণা করেছিলেন, ভারত যদি ভাগ হয় তবে সেটা ঘটবে তার মৃতদেহের ওপর দিয়ে; সেই ভারতবিভাজন তাকে জীবিত অবস্থাতেই মেনে নিতে হয়েছে এবং তার মৃত্যু ঘটেছে স্ব-সম্প্রদায়ের উগ্রপন্থীদের হাতে, বর্তমানে যারা ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন।
ইতিহাসের পাঠকে একালে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তদুপরি বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংরক্ষকরা চেষ্টা করছেন বৃহৎকে ক্ষুদ্রে পরিণত করতে। বড়কে ভেঙে ছোট টুকরো করা গেলে ভুক্তভোগীদের চোখ মূল জায়গাটিতে পড়ার পরিবর্তে এখানে-সেখানে আটকে যাবে
ইতিহাস আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না, মানুষের হাতেই তার গঠন ও চলাফেরা; কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে নিয়োজিত মানুষরা নিজেদের সীমাবদ্ধতার দরুন ভুল করে এবং সেই ভুলের খেসারত দিতে হয় তাদের তো বটেই, অন্য মানুষকেও। ইতিহাস মৃদু মৃদু হাসে। ১৯০৫-৪৭ সালের ভেতর ইতিহাস বহুবার বহু রকমের সুযোগ পেয়েছে পরিহাসের।
পরাধীন ভারতে উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির ধারা ছিল দুটি, একটি ক্ষমতা লাভের— অন্যটি জনগণের মুক্তির। ক্ষমতালিপ্সু ধারাটিই ছিল প্রধান। তারা ছিলেন জাতীয়তাবাদী। তাদের মনোভাবটি ছিল পরাজিতের অর্থাৎ আপসপন্থার। আলাপ-আলোচনা, দরকষাকষি, প্রয়োজনে জেল খাটার মধ্য দিয়ে তারা স্বাধীনতা চেয়েছেন এবং ১৯৪৭-এ যে ক্ষমতা লাভ করেছেন, সেটাকেই মনে করেছেন স্বাধীনতা। ভেবেছেন জয়ী হয়েছেন। আসলে যে জয় নয়, পরাজয়ই ঘটে গেছে— সেটা টের পাননি। কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদীরা চেয়েছিলেন অখণ্ড ভারত, সেটা তারা পাননি; মুসলিম লীগপন্থীদের কাম্য ছিল অখণ্ড পাকিস্তান, সে প্রাপ্তি থেকে তারাও বঞ্চিত হয়েছেন।
জনগণের মুক্তির জন্য লড়ছিলেন বামপন্থীরা, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কমিউনিস্টরা। তারা আপস চাননি, চেয়েছেন সামাজিক বিপ্লব। কিন্তু তাদের মধ্যেও পরাজিতের মনোভাব কার্যকর ছিল। বিপ্লবের জন্য বিপ্লবী সংগঠন চাই। সেই সংগঠন তারা গড়ে তুলতে পারেননি। দেশের শতকরা ৮০ জন মানুষ ছিলেন কৃষক। কমিউনিস্টরা তাদের সংগঠনের ভেতর নিয়ে আসতে সক্ষম হননি। কমিউনিস্টরা ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তাদের পক্ষে শ্রেণিচ্যুত হওয়া সম্ভব হয়নি। শ্রেণিচ্যুতির দুটি দিক, একটি হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ না দেখে মেহনতি মানুষের স্বার্থকে উচ্চে তুলে ধরা; অন্যটি মেহনতি মানুষের দৃষ্টিতে রাজনীতিকে দেখা ও বিচার করা। দুটি মিলে একটি একক। কমিউনিস্টরা যেন ধরেই নিয়েছিলেন, তাদের দ্বারা বিপ্লব সম্ভব নয়। তারা তাই জাতীয়তাবাদীদের ডিঙিয়ে সামনে যেতে পারেননি। ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময় তাদের আওয়াজ ছিল ‘গান্ধী-জিন্নাহ এক হও’। বিবৃতি দিয়ে তারা এমনও বলেছেন, তারা উপেক্ষণীয় নন, কেননা তারা হচ্ছেন তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, অর্থাৎ ছাগমাতার তৃতীয় শাবক, যে ছোটাছুটি করে কিন্তু মাতৃদুগ্ধপ্রাপ্তিতে অসমর্থই রয়ে যায়। সামাজিক বিপ্লবের প্রাথমিক শর্তই তো ছিল বিপ্লববিরোধী জাতীয়তাবাদীদের পিছু পিছু না হাঁটা। তাদের কিন্তু নিষিদ্ধ ওই কর্মটিই করতে হয়েছে। প্রচুর আত্মত্যাগ করেছেন; কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
ইতিহাসের এ বিবরণটির সঙ্গে শুধু রাজনীতিকদের নয়, সাহিত্যিকদেরও যুক্ততা ছিল। বাঙালি তার ভাষা নিয়ে গর্ব করে এবং শিক্ষিতরা সাহিত্যে অনুরাগী হয়ে থাকেন। সাহিত্যের ভেতর ইতিহাস থাকে এবং সাহিত্য নিজেও ইতিহাসকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। সেটা আমাদের ইতিহাসের বেলায়ও ঘটেছে। অভিজ্ঞতায় এ সত্যটাও ফুটে উঠেছে।
মূল দুই প্রান্তে দুই বড় ঘটনা। এক প্রান্তে প্রশাসনিক বঙ্গভঙ্গ, অপর প্রান্তে রক্তাক্ত রাষ্ট্রীয় দ্বিখণ্ডীকরণ। মাঝখানে শ্বাসরুদ্ধকর এক নাটক। নাটকের সে গল্পটাই মূল বিষয়। ১৯০৫ সালের যার শুরু এবং ১৯৪৭-এ সমাপ্তি। এই দুই ভাগের এক ভাগ। নাটকটি করুণ, কিন্তু কৌতূহলের। তার কাহিনিকে আমি গল্পের মতোই মনে করি। আশা করেছি, তাতে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কৌতূহলই জ্ঞানান্বেষণের প্রাথমিক ভিত্তি। ইতিহাস পাঠ যতই করা যায়, ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ ততই বৃদ্ধি পায় এবং ইতিহাস পাঠ করলে অতীতকে জানা, বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পথসন্ধান যে সহজ হয়, সে সত্য তো সর্বজনবিদিত। আসলেই নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞান ব্যক্তি এবং স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ একই পর্যায়ে পড়ে। শাসকশ্রেণি ইতিহাস লেখেন নিজেদের মতো করে, তাতে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে। বস্তুত মানবিক বিষয়ে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই; পক্ষপাত অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাস রচনা ও বর্ণনার ক্ষেত্রেও সেটা ঘটে। গল্পটাকে দেখতে চাই জনগণের মুক্তির যে প্রশ্ন, তারই আলোকে।
ইতিহাসের পাঠকে একালে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তদুপরি বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংরক্ষকরা চেষ্টা করছেন বৃহৎকে ক্ষুদ্রে পরিণত করতে। বড়কে ভেঙে ছোট টুকরো করা গেলে ভুক্তভোগীদের চোখ মূল জায়গাটিতে পড়ার পরিবর্তে এখানে-সেখানে আটকে যাবে। মূল জায়গাটিতে রয়েছে রাষ্ট্র ও সময়ের একটি বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থতা, যে ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী এবং যার অভ্যস্ত কাজ করছে পুঁজিবাদ।
আগের তুলনায় বর্তমানের অবস্থা অনেকটা ‘উন্নত’। কিন্তু সে উন্নয়ন পুঁজিবাদী ঘরানার, যা বৈষম্য বৃদ্ধি করে এবং বিচ্ছিন্নতাকে উৎসাহ জোগায়। উন্নয়নের সেই অভিঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্র ও অধিকারবিহীন হয়ে পড়েছে, অতি অল্পসংখ্যক উন্নতির বিপরীতে। উন্নতির অভ্যন্তরে এই অবনতির জন্য দায়ী পুঁজিবাদী উন্নয়ন নিজেই। ইতিহাসের বড় মাত্রার পরিহাসের এটিও একটি। মুক্তির উপায় হচ্ছে দেশে দেশে সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত করা, যে বিপ্লব সম্পদ ও সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা ঘটাবে এবং মানুষকে মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচার ব্যবস্থা করে দেবে। ইতিহাস কিন্তু ওই কথাটিও বলে যাচ্ছে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




