শিশুর হাতে বই নাকি অদৃশ্য বোঝা

শিশুর হাতে যে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা কতটা শিশুর জন্য! আমাদের পাঠ্যবই নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত কারিকুলাম, পরীক্ষা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে আসে। কিন্তু শিশুর হাতে থাকা বইটি কেমন! তার ভাষা কেমন! তার ছবি, কাগজ, ছাপা, গল্প, উদাহরণ, বিন্যাস— এসব কি শিশুর মানসিক জগতের সঙ্গে মেলে! নাকি বইটি শুধু একটি ‘সিলেবাসবাহী বস্তু’!
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের বহু পাঠ্যবই এখনো শিশুকে ‘শিশু’ হিসেবে দেখতে পুরোপুরি শিখতে পারেনি। আমাদের অনেক পাঠ্যবইয়ের ভাষা এমন, যেন তা একজন শিশু নয়, বরং একজন পরীক্ষক বা প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য লেখা। বাক্য দীর্ঘ, শব্দ ভারী, ব্যাখ্যা কৃত্রিম। শিশুর মুখের ভাষা ও বইয়ের ভাষার মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এটা শুধু নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যা নয়, এটা শিক্ষাগত সংকট। কারণ, ভাষাই শিক্ষার মূল ভিত্তি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর পেরিয়েও পাঠ বুঝতে পারে না। অনেকেই সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে বা নিজের ভাব স্পষ্ট করে লিখতে পারে না। কেউ নিজের নামটাও ঠিকঠাক মতো লিখতে পারে না।
এই বাস্তবতায় পাঠ্যবইয়ের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল ভাষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা। কিন্তু আমরা উল্টো শিশুদের সামনে এমন সব তথ্য, সংজ্ঞা ও তাত্ত্বিক উপস্থাপনা রাখছি, যা তাদের বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেন বইয়ের উদ্দেশ্য শেখানো নয়, ‘সবকিছু শিশুর মস্তিষ্কে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া’।
অনেক বই পড়ে মনে হয়, পাঠ্যবই রচনার সময় শিশুদের বোঝানোর চেয়ে লেখকদের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের আগ্রহ বেশি ছিল। শিশুর শেখা ধাপে ধাপে এগোনোর কথা; কিন্তু আমাদের বইয়ে প্রায়ই দেখা যায়, এক পৃষ্ঠায় একসঙ্গে বহু ধারণা, সংজ্ঞা, নতুন শব্দ ও অনুশীলন গুঁজে দেওয়া হয়েছে। ফলে বই হয়ে ওঠে মুখস্থের উপাদান, শেখার সঙ্গী নয়।
প্রশাসনিক কমিটি বা অ্যাকাডেমিক পাণ্ডিত্য দিয়ে শিশুদের বই তৈরি হয় না। শিশুদের জন্য বই লিখতে হলে আগে শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে জানতে হয়
আমরা বইকে সাধারণত তথ্য শেখানোর মাধ্যম হিসেবে দেখি; কিন্তু ভুলে যাই— একটি পাঠ্যবই শিশুর মন, ভাষা, আত্মবিশ্বাস, কল্পনা ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে তোলে। একজন শিশু পৃথিবীকে প্রথমে অনুভব করে, পরে বিশ্লেষণ করে। সে গল্পে মুগ্ধ হয়, ছবিতে ভাবতে শেখে, ছন্দে ভাষা আবিষ্কার করে। তাই প্রাথমিকের বই হওয়া উচিত কল্পনাময় ও শিশুর অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের অনেক পাঠ্যবইয়ে শিশুর সেই জগৎ অনুপস্থিত। সেখানে তথ্য আছে, কিন্তু বিস্ময় নেই; সংজ্ঞা আছে, কিন্তু আনন্দ নেই; অনুশীলনী আছে, কিন্তু কৌতূহল নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, শৈশবে শেখার সঙ্গে ইতিবাচক আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যে শিশু বই খুলে আনন্দ পায়, সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী ও অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠে। আর যে শিশু বই খুললেই ভয়, চাপ বা অক্ষমতা অনুভব করে, সে শেখাকে ধীরে ধীরে অপছন্দ করতে শুরু করে।
বর্তমান পাঠ্যবইয়ের বড় দুর্বলতা হলো, এগুলো শিশুকে ‘মানুষ’ হিসেবে নয়, অনেক সময় ‘পরীক্ষার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে শেখার স্বাভাবিক গতি, শিশুর মানসিক পরিপক্বতা কিংবা আবেগীয় চাহিদার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তথ্যের পরিমাণ। শিশুর মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার বদলে তৈরি হয় এক ধরনের ক্লান্তি ও চাপ।
শিশুর মানসিক বিকাশে অলংকরণ ও বইয়ের নান্দনিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুন্দর ছবি, উজ্জ্বল রঙ, খোলা স্পেস কিংবা জীবন্ত চরিত্র শিশুর কল্পনাশক্তিকে সক্রিয় করে। অথচ আমাদের বহু বইয়ে অলংকরণ এখনো যান্ত্রিক ও অনুপ্রাণনাহীন। যেন বই শিশুকে ডেকে নেয় না, বরং ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়।
একজন এগারো বছরের শিশু এখনো কল্পনার জগতে বাস করে। সে ছবি দেখে শেখে, গল্প শুনে শেখে, খেলতে খেলতে শেখে। অথচ আমাদের বহু বইয়ে কল্পনা, আনন্দ ও অনুসন্ধানের জায়গা কমে গিয়ে জায়গা নিয়েছে তথ্যের গাম্ভীর্য।
কাগজ ও ছাপার মান নিয়েও প্রতি বছর একই অভিযোগ ফিরে আসে। পাতলা কাগজ, ঝাপসা ছাপা, দুর্বল বাঁধাই, উল্টো বা বাদ পড়া পৃষ্ঠা— এসব এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কোথাও বই হাতে নিয়েই পৃষ্ঠা খুলে যায়, কোথাও কয়েকদিন ব্যবহারেই মলাট আলাদা হয়ে পড়ে। একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুর কাছে এই বই-ই হয়তো বছরের একমাত্র নতুন বই। সেই বই যদি টেকসই না হয়, চোখে আরাম না দেয়, পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করে— তাহলে বইয়ের প্রতি তার আবেগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাঠ্যবইয়ে শিশুর বাস্তব জীবন কতটা উপস্থিত! শহরের শিশু, গ্রামের শিশু, পাহাড়ের শিশু, নদীভাঙা অঞ্চলের শিশু— সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। কিন্তু বইয়ে প্রায়ই একটি একরৈখিক, কৃত্রিম বাস্তবতা দেখা যায়। শিশুর নিজস্ব জীবন, পারিবারিক বাস্তবতা, স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষাগত বৈচিত্র্য— এসবের প্রতিনিধিত্ব খুব সীমিত। এমনকি ইংরেজি বইগুলো নিয়েও গবেষণায় বলা হয়েছে, সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতির চেয়ে অনেক সময় বাইরের সাংস্কৃতিক কাঠামো বেশি প্রভাব ফেলেছে।
আমাদের পাঠ্যবই প্রণয়নে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিশুমনস্তত্ত্ববিদ, ভাষাবিদ, প্রাথমিক শিক্ষক, শিশুসাহিত্যিক, অলংকরণশিল্পী ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। শুধু প্রশাসনিক কমিটি বা অ্যাকাডেমিক পাণ্ডিত্য দিয়ে শিশুদের বই তৈরি হয় না। শিশুদের জন্য বই লিখতে হলে আগে শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে জানতে হয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ






