ভূরাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্র মরু-সীমান্তের সংঘাত

‘হুতি’ এখন সংবাদ শিরোনাম। হুতি কী? এটি হলো ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের একটি রাজনৈতিক-সামরিক আন্দোলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ। এর প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম থেকে এটিকে পশ্চিমা মিডিয়া হুতি আন্দোলন নামে প্রচার করছে। এর উত্থান শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে; ২০০৪ সালে সরকারি দমন-পীড়নের পর এটি সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয় এবং ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এরা হলো জায়দি শিয়া মুসলিম, যা কিনা শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র শাখা। এটি ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে হাজার বছর ধরে প্রভাবশালী। এদের আদর্শ হলো: জায়দি পরিচয় রক্ষা; বিদেশি (বিশেষত সৌদি-মার্কিন) প্রভাবের বিরোধিতা; দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং অন্যায় শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
জায়দি ইমামত এক হাজার বছর ধরে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে শাসন করেছে। ১৯৬২ সালের বিপ্লবে ইমামত বিলুপ্ত হলে জায়দি জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই বঞ্চনা পরবর্তী হুতি আন্দোলনের মানসিক ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৮০-এর দশকে বদরুদ্দিন আল-হুতি জায়দি পরিচয় রক্ষায় একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ‘ইউনিয়ন অব বিলিভিং ইয়ুথ’ নামে একটি সংগঠনে যুক্ত হন, যা পরে হুতি আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ২০০০ সালের পর তার ছেলে হুসেইন আল-হুতি সংগঠনটিকে আরও রাজনৈতিক ও র্যাডিকাল রূপ দেন। এর লক্ষ্য ছিল— ইয়েমেনি সরকারের দুর্নীতির বিরোধিতা; সৌদি সমর্থিত সালাফি প্রভাবের প্রতিরোধ এবং জায়দি জনগোষ্ঠীর অধিকার পুনরুদ্ধার।
২০০৪ সালে ইয়েমেন সরকার হুসেইন আল-হুতিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে আন্দোলন সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। এ বছর হুসেইন নিহত হন, কিন্তু তার মৃত্যু আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। ২০০৪-২০১০ পর্যন্ত ছয় দফা যুদ্ধ চলে ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে।
২০১১-২০১৪ সালে ‘আরব বসন্তে’ ইয়েমেন রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে হুতিরা উত্তরাঞ্চল দখল করে এবং ২০১৪ সালে রাজধানী সানা কবজা করে। ২০১৫ সালে তারা প্রেসিডেন্টকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এটি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দেয়।
২০১৫ সালে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। হুতিরা ইরানের সমর্থন পায়— অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক সহায়তা। ফলে ইয়েমেন নিয়ে শুরু হয় ইরান-সৌদি আরব ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার। এই সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটে ঠেলে দেয়।
২০২৩ সালে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের পর হুতিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। ২০২৪ সালে এই হামলায় সুয়েজ খালের বাণিজ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাহত হয়। ২০২৬ সালে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলে।
আজ হুতিরা এমন এক শক্তি, যারা ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে; ইরানি প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে; বৈশ্বিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। এরা এখন সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
হুতি আন্দোলন যেন ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি উপত্যকায় জন্ম নেওয়া এক দীর্ঘ প্রতিরোধের গল্প; যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক বঞ্চনা, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতি একসূত্রে গাঁথা। একটি ছোট ধর্মীয় সংগঠন থেকে তারা হয়ে উঠেছে এক আঞ্চলিক শক্তি, এক সামরিক বাস্তবতা এবং এক ভূরাজনৈতিক ঝড়।
হুতিদের ড্রোন শুধু একটি যান্ত্রিক বস্তু নয়; এটি এক মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দর, জিজানের তেল স্থাপনা, নাজরানের আবাসিক এলাকা— সবই এই বার্তার সাক্ষী
আরব উপদ্বীপের ইতিহাস কখনোই নিস্তরঙ্গ ছিল না। ইয়েমেন—একসময় সাবা রাজ্যের গৌরবময় ভূমি, আর সৌদি আরব— মরুর বুকে নবজাত রাষ্ট্র; দুটি ভূখণ্ডের সম্পর্ক বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্য, গোত্র, ধর্ম, রাজনীতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্রোতে গড়ে উঠেছে। ১৯৬২ সালের ইয়েমেনি বিপ্লব, মিসর-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তরের পাহাড়ি গোত্রের উত্থান— সবই এই সীমান্তকে বারবার অস্থির করেছে। কিন্তু ২০১৪ সালে হুতিদের সানা দখল যেন ইতিহাসের বালুকণাকে আবার ঝড়ের মুখে ঠেলে দিল। সীমান্তের ওপারে যে আগুন জ্বলেছিল, তার উত্তাপ খুব দ্রুতই সৌদি আকাশে প্রতিফলিত হতে থাকে। এই সংঘাত আর শুধু ভূরাজনীতি নয়; এটি ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া, যা আজকের সৌদি সমাজের মনোজগতে এসে পড়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে যখন হুতিদের ড্রোন উড়ে আসে, তখন তা শুধু একটি যান্ত্রিক বস্তু নয়; এটি এক মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দর, জিজানের তেল স্থাপনা, নাজরানের আবাসিক এলাকা— সবই এই বার্তার সাক্ষী। সৌদি নাগরিকের মনে জন্ম নেয় এক নতুন অনুভূতি— নিরাপত্তা আর দূরের কোনো ধারণা নয়; এটি এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সৌদি আরবের অর্থনীতি তেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি ইতিহাসের নির্মিত বাস্তবতা। হুতি হামলার লক্ষ্য যখন জ্বালানি স্থাপনা, তখন আঘাতটি শুধু একটি স্থাপনার নয়; এটি ভবিষ্যতের ওপর আঘাত। ২০১৯ সালের আবকাইক-খুরাইস হামলা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়, একটি ছোট ড্রোনও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব দেখা যায় নানান ক্ষেত্রে— সৌদি ভিশন ২০৩০-এর বিনিয়োগ পরিবেশে চাপ, জ্বালানি রুটের পুনর্বিন্যাস এবং দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা।
যুদ্ধ মানুষের পরিচয়কে বদলে দেয়। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এখন নিজেদের এক ধরনের সীমান্তরক্ষক নাগরিক মনে করে। তাদের জীবনে দেশরক্ষার অনুভূতি অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। জাতীয়তাবোধও নতুন রূপে জাগে। সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়, আমরা আছি, আমরা টিকে থাকব— এই বার্তা। যুদ্ধের ভয় কখনো কখনো জাতির আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। কিন্তু এই দৃঢ়তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর আকাঙ্ক্ষা— শান্তি। দীর্ঘ সংঘাত মানুষকে ক্লান্ত করে; তারা চায় সীমান্তে আবার নীরবতা ফিরুক।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি, ওমানের মধ্যস্থতা, সৌদি-ইরান পুনর্মিলন— সবই সংঘাতকে কিছুটা শান্ত করেছে। ইতিহাস বলে, যুদ্ধের পরেই কূটনীতি সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। সৌদি আরব এখন কৌশল নিয়েছে, সে বিস্তৃত যুদ্ধ নয়; সীমিত প্রতিরোধ করবে, সরাসরি আলোচনার পথ খোলা রাখবে এবং ইয়েমেনের স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা হবে।
তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, এই সংঘাতের কার্যকর সমাধান নির্ভর করে ইরান-সৌদি আরব সমঝোতার ওপর। দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক-সামরিক সহযোগিতা কোন স্তরে থাকবে কি থাকবে না, সেটিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এখন আর সৌদি-ইয়েমেন সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক




