ইসরায়েলকে কেন সর্বোচ্চ গোয়েন্দা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে পেন্টাগন?

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্রদের অন্যতম। সামরিক সহযোগিতা, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা। আর সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক এক বিতর্কে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তিজনিত ঝুঁকির মাত্রা ‘হাই’ থেকে ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
যদিও এ বিষয়ে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি এবং হোয়াইট হাউসও প্রতিবেদনটি অস্বীকার করেছে। তবু বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্বেগের মূল কারণ ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখে ইসরায়েল। দেশটির আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরানের সঙ্গে এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছে। যা ভবিষ্যতে ইরানের ওপর চাপ কমিয়ে দেয়, তাহলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, সামরিক কর্মকর্তা এবং বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের তৎপরতা বাড়িয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন। তাদের ধারণা, ওয়াশিংটনের অবস্থান, আলোচনার অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে চায় তেল আবিব।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের ঘিরে নজরদারির উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলে অবস্থানরত কিছু মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ পর্যবেক্ষণকারী সফটওয়্যার স্থাপনের অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
ইসরায়েল অবশ্য অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনে দেশটির দূতাবাস জানিয়েছে, তারা মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় না। হোয়াইট হাউসও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
তবে ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ড বিপুল পরিমাণ গোপন তথ্য ইসরায়েলের কাছে সরবরাহ করার দায়ে গ্রেপ্তার হন। পরে তিনি দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত গুপ্তচরবৃত্তির কেলেঙ্কারিগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কারণ রাষ্ট্রগুলো কেবল বন্ধুত্বের ভিত্তিতে নয়, নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং নীতিনির্ধারণী অবস্থান জানার চেষ্টা চলতে পারে।
সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হোক বা না হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। আর যখন কৌশলগত অবস্থানে পার্থক্য তৈরি হয়, তখন প্রকাশ্য কূটনীতির পাশাপাশি পর্দার আড়ালের তথ্যযুদ্ধও গুরুত্ব পেতে শুরু করে। পেন্টাগনকে ঘিরে এই বিতর্ক সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।







