ইরানের নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বাড়ছে উত্তেজনা। আর সেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। এর মধ্যেই ইরান দাবি করেছে, তারা নতুন একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ঘটনাটি শুধু সামরিক নয়, ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কাছে কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে ‘আরাশ-ই কামানগির’ নামে নতুন একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ইরানের ভাষায় এটি ছিল এই প্রযুক্তির প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবহার।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আর সত্যিই যদি এমন সক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য কতটা উদ্বেগের বিষয়?
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা।
গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। ইরানের সামরিক স্থাপনায় একাধিক হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাল্টা জবাবও দিয়েছে তেহরান।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কী বলছে ইরান?
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ‘আরাশ-ই কামানগির’ এমন একটি ব্যবস্থা যা স্টেলথ বা রাডারে কম ধরা পড়ে এমন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম। যদিও তারা এর প্রযুক্তিগত বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
‘আরাশ’ নামটি নেওয়া হয়েছে পারস্যের একটি কিংবদন্তি চরিত্র থেকে। লোককথা অনুযায়ী, এই বীর এক তীর ছুড়ে ইরানের সীমান্ত নির্ধারণ করেছিলেন। ইরান এই নাম ব্যবহার করে মূলত একটি প্রতীকী বার্তাও দিতে চেয়েছে— তারা নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় প্রস্তুত।
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনটি তাদের আকাশসীমা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল। তাই সেটিকে ধ্বংস করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সম্প্রতি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেলফ-ডিফেন্স স্ট্রাইক’ বা প্রতিরক্ষামূলক হামলা চালানো হয়েছে।
ওয়াশিংটন বলছে, তাদের সেনা ও যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এদিকে ইরানও দাবি করছে, তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা যাচ্ছে।
‘আরাশ-ই কামানগির’ আসলে কী?
সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এটি হয়তো সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রযুক্তি নয়। বরং ইরানের আগের স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উন্নত সংস্করণ হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি এমন ধরনের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, যা খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো যায়।
বড় রাডার বা স্থায়ী ঘাঁটির ওপর নির্ভর না করে এটি হয়তো তাপ শনাক্তকারী বা অপটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে। এ ধরনের ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো, এগুলো সহজে শনাক্ত করা যায় না। ফলে শত্রুপক্ষের জন্য এগুলো ধ্বংস করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে উড়ে নজরদারি চালায়। এই ধীরগতির কারণেই এমন ড্রোন মোবাইল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য হতে পারে।
ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল বদলাচ্ছে?
ইরানের বড় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গত কয়েক মাসে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশটি আগে রাশিয়ার এস-৩০০সহ বড় রাডারনির্ভর ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এসব স্থায়ী ঘাঁটি সহজে শনাক্ত করা যায় এবং বিমান হামলায় ধ্বংস করাও তুলনামূলক সহজ। এ কারণে এখন ইরান ধীরে ধীরে ছোট, সস্তা এবং মোবাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেও ইরান শিক্ষা নিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, কম খরচের মোবাইল অস্ত্রও অনেক সময় উন্নত প্রযুক্তির বড় অস্ত্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। ইরান এখন এমন কৌশল নিচ্ছে, যেখানে শত্রুর পুরো বিমান শক্তি ধ্বংস করার চেয়ে তাদের জন্য যুদ্ধকে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলাই মূল লক্ষ্য।
কেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এটি উদ্বেগের?
যদি ইরানের দাবি সত্যি হয়, তাহলে এর মানে দাঁড়ায়— তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বরং এখনো এমন সক্ষমতা আছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান ও ড্রোন অভিযানে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রিপার ড্রোনের মতো ব্যয়বহুল নজরদারি ড্রোন হারানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ এই ড্রোন শুধু নজরদারিই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালাতে পারে।
অন্যদিকে ইরান তুলনামূলক কম খরচে শাহেদ ড্রোন ও স্বল্প-পাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে এটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও তাদের কিছুটা সুবিধা দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ইরান পুরোপুরি প্রযুক্তিগত সমতা অর্জনের চেষ্টা করছে না। বরং তাদের কৌশল হচ্ছে— সহজে টিকে থাকা, দ্রুত পুনর্গঠন করা এবং শত্রুকে দীর্ঘমেয়াদি চাপে রাখা।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
যদি কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে যায়, তাহলে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর সেই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দামও হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
‘আরাশ-ই কামানগির’ শুধু একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার নাম নয়। এটি ইরানের নতুন সামরিক কৌশলেরও প্রতীক— কম খরচে, দ্রুত চলমান এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সক্ষমতা কতটা বাস্তব এবং ভবিষ্যতের সংঘাতে তা কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয়। তবে এটুকু স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে উত্তেজনা এখনো শেষ হয়নি।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, সিবিএস নিউজ, জেরুজালেম পোস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া






