স্বাধীন বেলুচিস্তান এখন পর্যন্ত ফেসবুকের কল্প-গল্প
- আফগানিস্তানে অবস্থানরত তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ব্যবহার করে ভারত প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে বলে দাবি পাকিস্তান সরকারের।

স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বালুচেরা। ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের আন-ভেরিফায়েড
পোস্টে স্বাধীন দেশ হিসেবে বেলুচিস্তানের আত্মপ্রকাশের তথ্য প্রচারিত হতে দেখা
যাচ্ছে। এসব পোস্টের দাবি করা হচ্ছে, এই অঞ্চলের ৮৫ শতাংশের দখল নিয়েছে বেলুচিস্তান সেনাবাহিনী। এমনকি নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুদ্রা, প্রশাসন প্রচলনের দাবিও রয়েছে কোন
কোন পোস্টে। এ অঞ্চলের খনিজ সম্পদ বিশেষ করে দু’শোর বেশি কয়লা খনির দখল নিয়েছে নিজস্ব প্রশাসন, এমন দাবিও করছে কেউ কেউ।
তবে ঐ স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট সম্পর্কে কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি পাকিস্তান সরকার। এ ছাড়াও এই পোস্টগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে চলা বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা বিষয়ক প্রচারণার অংশ হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। বেলুচিস্তানের ভূমি বাস্তবতায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সম্পর্কে দ্য বেলুচিস্তান পোস্টের এক্স হ্যান্ডেলে গিয়ে ধারণা পেতে পারেন যে কোন পাঠক।
এ অঞ্চলের কথিত স্বাধীনতা ঘোষণার প্রচারণা সম্পর্কে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। গত বছর পাকিস্তানে যখন ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করেছিল ভারত, তখন ভারতীয় গণমাধ্যম যেভাবে ‘ভারতীয় সেনারা করাচী বন্দর, লাহোর, ইসলামাবাদ দখল ও পতাকা’ উড়ানোর খবর গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশন ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য করে প্রচার করেছিল, এবারের বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার খবরেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের অতিরঞ্জিত উপস্থাপনার ছাপ।
ইসলামাবাদে আটক থাকা ভারতীয় গোয়েন্দা কুলভূষণ যাদবকে বেলুচিস্তানে গ্রেপ্তারের পর থেকেই যেকোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান। সম্প্রতি বেলুচিস্তানে একটি ট্রেন ছিনতাইয়ের ঘটনায় সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্র, যোগাযোগ সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ে তাদের অভিযোগ, এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশাদার সামরিক বাহিনী।
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে দিল্লি সরকারের সম্পর্ক, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে প্রবেশ করে সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা এবং তারপর আফগানিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে, সেদেশে লুকিয়ে থাকা তেহেরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যবহার করে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবেই বর্ণনা করেছে পাকিস্তান।
এতকাল পর্যন্ত বেলুচিস্তান স্বাধীনের প্রকল্পটিকে কেবল ভারতীয় অভিলাষ হিসেবেই মনে করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ থামাতে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার ঘটনায়; ইরান ও পাকিস্তানের ব্যাপারে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল।
এ অঞ্চলে ভারত ইসরায়েলের একমাত্র বন্ধু দেশ হওয়ায়; বেলুচিস্তান ইস্যুতে ইসরায়েল জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেলুচিস্তানের আরেকটি অংশ সিসতান বেলুচিস্তান ইরানের অংশ। পাকিস্তানের বালুচিস্তান আর ইরানের সিসতান বেলুচিস্তান নিয়ে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইজরায়েল ও ভারত একযোগে কাজ করছে, এমন বিশ্লেষণও উঠে এসেছে। বৃহত্তর বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করা গেলে ভারত ও ইসরায়েল এ অঞ্চলে পাকিস্তান ও ইরানকে দুর্বল করে দিতে পারবে, এমন একটি ‘কল্পনা’ কাজ করছে। একে কল্পনা বলার কারণ; সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণার মাধ্যমে স্বাধীন বেলুচিস্তানের ঘোষণা দেওয়া। ভূমি বাস্তবতায় এখনো পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বালুচিস্তানের ওপর। আর ইরানের নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সিসতান বেলুচিস্তানের ওপর।
বেলুচিস্তানে চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকায় ভারত সেখানে প্রতিপত্তি তৈরি করে যুগপৎ চীন ও পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে চায়, এমন মনোভঙ্গি ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণায় লক্ষণীয়।
বেলুচিস্তানে নিজের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় রয়েছে চীন। আর ইরানের সামরিক সামর্থ্যের পরিধি সাম্প্রতিক ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধে আমরা লক্ষ্য করেছি। ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর জবাব পাকিস্তান বেশ কড়াভাবেই দিয়েছিলো। ফলে ধর্ম ও পৌরাণিক গ্রন্থের অনুপ্রেরণায় ইজরায়েলের যে গ্রেটার ইজরায়েল আর ভারতের যে অখণ্ড ভারত রচনার অসম্ভব কল্পনা, তা বাস্তব ভিত্তি পাওয়া খুবই কঠিন।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, ফলে তাদের কোন সংঘাতকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যেতে দেবে না বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো। ফলে বলিউডের ‘ধুরন্ধর’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের আদলে বালুচিস্তানে কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এতো সহজে হওয়ার কথা নয়।
আফগানিস্তানে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যবহার করে বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করা এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ার কল্প-গল্পই। কখনো ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামের কল্প-গল্প বাস্তব ভিত্তি পেতে শুরু করলে তখন নিশ্চয়ই সে বিষয়ে লেখা যাবে।
লেখক: এডিটর-ইন-চিফ, ই-সাউথএশিয়া




