আগামীর চোখ
জিরো পয়েন্ট থেকে পীরগঞ্জ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
আবু সাঈদ,
লাল সালাম নিও। আজ তোমাকে চিঠি লিখতে বসে আমার বুকের ভেতর এক তীব্র স্পন্দন অনুভব করছি। ঢাকার জিরো পয়েন্টের তপ্ত পিচঢালা রাজপথ থেকে পীরগঞ্জের বুক চিরে উঠে আসা মেঠোপথ— আমাদের দূরত্বের সীমানা তো শুধু কয়েক দশকের ধুলোবালি। আমরা দুজনেই ইতিহাসের এক সমান্তরালে দাঁড়িয়ে।
আজ ১৬ জুলাই। তোমার চলে যাওয়ার দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে যখন তুমি দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলে, আমি দূর আকাশ থেকে নিজের পুরনো প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম। আমার বুকে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, আর তোমার দুই চোখ মেলে ধরা বুকটাই হয়ে উঠেছিল আস্ত এক জীবন্ত স্লোগান। কী আশ্চর্য! ইতিহাসের চাকা ঘুরে ঠিক একই বিন্দুতে এসে থমকে দাঁড়াল। আমার শরীরের বুলেট আর তোমার বুকের ছররা গুলি— সব তো একই কামারের তপ্ত লোহা থেকে তৈরি, সাঈদ। ঘাতকের পোশাক বদলায়, বন্দুকের নল বদলায়, কিন্তু শোষকের হিংস্র চোখগুলো কখনো বদলায় না।
‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই আমার লাশ...’
হ্যাঁ সাঈদ, আমরা তো এই বাংলার পবিত্র মাটিতে আমাদের নিথর লাশটুকু ঠেকিয়েই মুক্তি চেয়েছিলাম। তুমি যখন নিথর হয়ে ঢলে পড়লে, আমি দেখেছিলাম গোটা বাংলাদেশ কীভাবে জ্বলে উঠেছিল। তোমার ওই দুই হাত ছড়ানো ভঙ্গিটি— উড়বার স্থির ছবি হয়ে আছে।
জিরো পয়েন্টে আমার সেই নিঃসঙ্গ যাত্রা আর বেরোবির গেটে তোমার সেই একক প্রতিরোধ আসলে একই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের অংশ
কিন্তু ওপারে বসে আমরা যখন এই রূপসী বাংলার দিকে তাকাই, এক গভীর দীর্ঘশ্বাস আমাদের গ্রাস করে। যে বৈষম্যহীন আর গণতান্ত্রিক ভোরের জন্য আমরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিলাম, সেই ভোর কি সকাল হতে পেরেছে? শাসকের সিংহাসন বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য কি খুব বেশি বদলায়? নাকি ক্ষমতাসীনরা আজও আমাদের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছায়, আর আমাদের স্বপ্নগুলোকে বুটের তলায় পিষ্ট করে।
কী অদ্ভুত পরিহাস সাঈদ, খুনি শাসকরা আমাদের শরীর ঝাঁজরা করেই ক্ষান্ত হয়নি; নিজেদের পাপ ঢাকতে আমাদের চরিত্র হনন করতে চেয়েছিল। আমাকে বলেছে ‘হিরোইঞ্চি’ আর তোমাকে ‘মাদকাসক্ত’ ‘উগ্রবাদী’। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে আমরা তো তাদের মুক্তির ডাকনাম— সেই বদনাম আমাদের স্পর্শ করেনি।
লড়াই থেমে থাকে না, সাঈদ। কবীর সুমনের সেই অমোঘ উচ্চারণ আজ আমাদের আত্মায় প্রতিধ্বনিত হয়— ‘যে যেখানে লড়ে যায় আমাদের লড়া’। জিরো পয়েন্টে আমার সেই নিঃসঙ্গ যাত্রা আর বেরোবির গেটে তোমার সেই একক প্রতিরোধ আসলে একই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের অংশ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শোষিতের এই প্রতিরোধ এক সুতোয় গাঁথা।
ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি শহীদের রক্তবিন্দু একেকটি অবিনশ্বর বীজে পরিণত হয়। রক্ত কখনো মিথ্যে হয় না, সাঈদ; তা শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে থাকে।
ভালো থেকো, অনুজ আমার। তোমার জন্য ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা।
ইতি
চিরকালের সহযোদ্ধা, নূর হোসেন




