শিশুদের স্বপ্ন ফেরাচ্ছেন ইদ্রিস আলী

ইদ্রিস আলী প্রতিষ্ঠিত কোস্টাল এইড স্কুলে পাঠদান চলছে
কপোতাক্ষ নদের তীরঘেঁষা সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সর্বদক্ষিণে রুইয়ারবিল গ্রাম। প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাস হলেও দীর্ঘদিন সেখানে ছিল না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কাছের বিদ্যালয়ে যেতে শিশুদের পাড়ি দিতে হতো প্রায় তিন কিলোমিটার দুর্গম পথ। ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম পথের কারণে শিশুদের একা বিদ্যালয়ে পাঠাতে সাহস পেতেন না অভিভাবকরা।
ফলে অনেক শিশুর পড়াশোনায় হাতেখড়িই হতো না। বই-খাতার বদলে কেউ বাবার সঙ্গে দুবলারচরের শুঁটকিপল্লিতে যেত, কেউ কেউ মাছ ধরাসহ পরিবারের জীবিকার কাজে জড়াত। শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকা সেই শিশুদের জীবনে এখন আশার নাম ‘কোস্টাল এইড স্কুল’।
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে তিনটি শ্রেণিতে পড়ছে ৬০ শিশু। পাঠদানের দায়িত্বে আছেন দুজন শিক্ষক। শিশুদের বিনামূল্যে বই, খাতা-কলম, শীতবস্ত্র ও ঈদসামগ্রী দেওয়া হয়। ক্লাস শেষে তাদের নিয়মিত দেওয়া হয় বিস্কুট।
এই বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী। এলাকাবাসীর কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, দুর্যোগ-দুঃসময়ে নির্ভরতারও নাম।
আগামীর সময়কে ইদ্রিস আলী বলছিলেন, ‘আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রাকাটি গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে আমার জন্ম। মেধার জোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও টাকার অভাবে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাবার একমাত্র গরুটি বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। গরিব বাবা, বিধবা বোন ও এলাকার মানুষের সহযোগিতায় আমার পড়াশোনা এগিয়েছে। জীবনের সেই কষ্ট আমাকে শিখিয়েছে, সামান্য সহযোগিতাও একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।’
ইদ্রিস জানিয়েছেন, প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতেন। পরে ২০১৮ সালে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে ‘হিউম্যানিটি ফার্স্ট’ নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সংগঠনটি পরে ‘কোস্টাল এইড অর্গানাইজেশন’ নামে সমাজসেবা কার্যালয়ে নিবন্ধিত হয়।
ইদ্রিস আলীর ভাষ্য, তার উদ্যোগে বর্তমানে কোস্টাল এইড স্কুলের পাশাপাশি খুলনার পাইকগাছায় নুরুল ইলম হিফজ মাদ্রাসা, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পদ্মপুকুরে ইকরা তাহফিজুল কুরআন হাফেজিয়া মাদ্রাসাও পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।
প্রতি মাসে শতাধিক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, সুপেয় পানির জন্য নলকূপ স্থাপন, প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের হুইলচেয়ার এবং অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কাউকে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন, কাউকে ভ্যান, গবাদি পশু বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের উপকরণ।
‘যখন আমার থাকার ঘর ছিল না, তখন ইদ্রিস স্যার আমাকে ঘর তৈরি করে দেন। দুঃসময়ে তিনি আমার পাশে ছিলেন, আমাকে ব্যবসার পুঁজি দিয়েছেন। এখন আমি একটি হোটেলের মালিক এবং স্বাবলম্বী ব্যবসায়ী। স্যারের সহযোগিতা না পেলে হয়তো এত দূর আসতে পারতাম না’— বললেন প্রতাপনগরের কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের এতিম বাইজিদ ইসলাম।
ইদ্রিস আলী বলেছেন, ‘আমরা চেষ্টা করি একজন মানুষ যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। যত দিন সামর্থ্য থাকবে, উপকূলের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে কাজ করে যাব।’
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালীর ভাষ্য, ‘ইদ্রিস আলী আমাদের উপকূলের গর্বের সন্তান। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি উপকূলের মানুষের কল্যাণে যে কাজ করছেন, তা অনুকরণীয়। রুইয়ারবিলের মতো দুর্গম গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি শিশুদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ এলাকায় মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন।’
আশাশুনি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘ইদ্রিস মানুষকে শুধু সহায়তা নয়, স্বাবলম্বী করে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। এ ধরনের মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’




