ঋণের বোঝা পাথর শ্রমিকের কাঁধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙা পাথরের স্তূপ। যেখানে অন্য সময় হাতুড়ির শব্দে মুখর থাকে চারপাশ, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। কাজের অপেক্ষায় কয়েকজন শ্রমিক বসে আছেন গাছতলায়। কেউ মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন— যদি হঠাৎ কোনো পাথরবোঝাই ট্রাক এসে ঢোকে। সেই অপেক্ষার সারিতে আছেন মহর উদ্দিনও। সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ তিনি। প্রায় এক মাস ধরে নিয়মিত কাজ নেই। সংসার চলছে ধারদেনা করে।
‘কয়দিন কাম থাহে, তহন সংসারডা কোনোরহম চলে। কিন্তু পাথর আসা বন্ধ হইলে তহন ঋণ কইরা খাওন লাগে। টুকটাক পাথর ভাঙি দিনে দুই-আড়াইশ টাকা পাই। এই টেহা দিয়া সাতজন মানুষ কীভাবে চলব? তাই ঋণ কইরা চলতাছি। আবার পাথর আইলে কিস্তি দিমু। আবার বন্ধ অইলে নতুন কইরা ঋণ করুম। ঋণ আমাগো পিছই ছাড়ে না’— আক্ষেপ করেন তিনি।
শুধু মহর উদ্দিন নন, একই গল্প শোনালেন হারুন অর রশীদ। তিনিও পাথর শ্রমিক। তার কথায়, ‘ঋণ কইরা খাই, আবার শোধ করি। তারপর আবার ঋণ করি। এইভাবেই চলতাছে জীবন।’
দুজনের গল্প আলাদা হলেও বাস্তবতা এক। আর সেই বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাকুগাঁও স্থলবন্দরের প্রায় চার হাজার শ্রমিকের জীবন। শ্রমিকদের এই অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে সীমান্তের ওপারের একটি সংকট। ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ডালু-তুরা মহাসড়কসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক। এ কারণে প্রায় এক মাস ধরে নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে পাথরসহ সব ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যত বন্ধ।
যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সীমান্তঘেঁষা এই বন্দরের অর্থনীতিতে। একদিকে যেমন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা, অন্যদিকে লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়ও প্রায় শূন্যের কোঠায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, ১৯৯৭ সালে নাকুগাঁও শুল্ক বন্দরের কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০২ সালে কয়লা ও পাথর ছাড়া বন্ধ হয়ে যায় অন্য সব পণ্য আমদানি। পরে ২০০৯ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর এবং ২০১৫ সালে স্থলবন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে ২১টি পণ্য আমদানির অনুমতি থাকলেও বাস্তবে আমদানি হচ্ছে শুধু পাথর। ফলে এই একটি পণ্যের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বন্দরের ব্যবসা ও শ্রমবাজার।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মেঘালয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ গারো হিলস জেলার ডালু-মহেন্দ্রগঞ্জ-গারোবাঁধা-তুরা এবং ডালু-তুরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও অতিবৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে গেছে। অনেক স্থানে পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাক আটকা পড়েছিল। ফলে নাকুগাঁও স্থলবন্দরে কোনো পণ্য পৌঁছাতে পারছে না। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শত শত লোড-আনলোড শ্রমিক। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই এখন ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল।
১১ বছর ধরে পাথর ভাঙার কাজ করেন হারুনুর রশিদ। তার ভাষায়, ‘এই কাজ কইরাই সাতজনের সংসার চালাই। এক মাস ধইরা কাজ নাই। যা জমানো টাকা আছিল, সব শেষ। এহন পরিবার লইয়া কীভাবে চলমু, সেই চিন্তায় আছি।’
একই অবস্থা খাইরুল ইসলামের। তিনি বললেন, ‘এক মাস ধইরা কাম বন্ধ। আমরা তো এই কামডাই শিখছি। অন্য কামও পাই না, যা সঞ্চয় আছিল শেষ। এহন ঋণ কইরা চলতাছি।’
শ্রমিকদের এই সংকটের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। নাকুগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, প্রায় এক মাস ধরে পাথর না আসায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে। বর্ষা এলেই ভারতের অংশে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ওপর। তবে নতুন করে বৃষ্টি না হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাস্তা মেরামতের কাজ শেষ হতে পারে। সেক্ষেত্রে পণ্য আমদানি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন তিনি।
এই স্থবিরতার আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি রাজস্ব আয়ে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬১৪ টন পাথর। এ থেকে কাস্টমস বিভাগ ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৯১ টাকা এবং স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৮ টাকা ট্যারিফ আদায় করেছে। তবে এই আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভারতের অংশে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রায় এক মাস ধরে কোনো পাথর বা কয়লাবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে আরও জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। তবে গত মঙ্গলবার সকালে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে ভুটান থেকে একটি পাথরবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করেছিল। দীর্ঘদিন আমদানি বন্ধ থাকায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।’




