তারা ছাড়াই জ্বলছে স্পেন

১৬ বছর পর নতুন আরেক প্রজন্মের হাত ধরে স্পেন দ্বিতীয়বার পৌঁছাল বিশ্বকাপ ফাইনালে।
১৯৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিল নাকি ২০০৮ ইউরো-২০১০ বিশ্বকাপ আর ২০১২ ইউরো জয়ী স্পেন— কোন দলটি সেরা, এ নিয়ে তর্ক চলেছে বহুদিন। জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োল, ক্যাসিয়াস, পিকেরা সবাই ততদিনে জিতেছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগও। ১৬ বছর পর নতুন আরেক প্রজন্মের হাত ধরে স্পেন দ্বিতীয়বার পৌঁছাল বিশ্বকাপ ফাইনালে। অথচ এই দলের সর্বোচ্চ ৫ গোল করা ফরোয়ার্ড মিকেল ওয়ারসাবালকে স্পেনের বাইরে কেউ চেনেন না সেভাবে।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের আক্রমণ ভোঁতা করার পাশাপাশি দলের দ্বিতীয় গোল করা পেদ্রো পোরোকে চার বছরে একটি ম্যাচও খেলায়নি ম্যানচেস্টার সিটি! লামিন ইয়ামাল, রোদ্রি, পেদ্রি, কুকুরেয়ারা তারকা হলেও মহাতারকা নন। অন্যরা ২০১০ সালের দলের তুলনায় বিশ্ব জুড়ে পরিচিত মুখও নন। অথচ শুধু দলীয় সমন্বয়ে তারা ছাড়াই জ্বলে উঠল স্পেন। সেই আলোয় পুড়ে ছাই ফ্রান্সের মতো পরাশক্তি।
তারুণ্যের এই শক্তিতে স্পেন টানা তিনটি সেমিফাইনালে বিদায় করল ফ্রান্সকে। ইউরোর সেমিফাইনালে ২-১, নেশনস লিগের শেষ চার ৫-৪ আর বিশ্বকাপে তারা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের হারাল ২-০ গোলে। স্পেন ভালোই জানে বিধ্বংসী আক্রমণভাগের কোনো দলের বিপক্ষে যখন খেলতে হয়, তখন মাঠে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করতে হয় সবাইকে। স্প্যানিশরা ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছে।
এমবাপ্পে, ওলিসে, দেম্বেলে ও দুয়ের (অথবা বারকোলা) মতো খেলোয়াড়দের উপস্থিতিই মাঠের খেলার গতি নির্ধারণ করে দেয়। তাদের বিপক্ষে নিজেদের গোলপোস্টের কাছাকাছি রক্ষণভাগ সামলানোর মানে হলো তাদের পায়ে দীর্ঘক্ষণ বল ছেড়ে দেওয়া। তারা গতি নিয়ে ফাঁকা জায়গায় আক্রমণ করতে যেমন ভালোবাসে, তেমনি প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণভাগও ভেঙে ফেলে অনায়াসে। পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রেখে সেটিই করতে দেয়নি স্পেন।
বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে তারা ফ্রান্সকে দীর্ঘক্ষণ রক্ষণাত্মক খেলতে বাধ্য করেছে। আরেকটি কৌশল ছিল, আক্রমণ থেকে বড় বিপদ তৈরি করতে না পারলেও আক্রমণটি শেষ করে আসা। এটি এমন এক বল দখলের কৌশল, যার লক্ষ্য গোল করার সুযোগ তৈরি করা অথবা বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিপক্ষকে কাউন্টার-অ্যাটাক করার সুযোগ না দেওয়া। বল ছাড়াও তারা বিপজ্জনক হতে দেয়নি ফ্রান্সকে। এভাবেই স্পেন আসলে অ্যানাকোন্ডার মতো পেঁচিয়ে ধরেছিল ফ্রান্সকে।
ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন রোদ্রি। ওয়ান-টু-ওয়ান লড়াইগুলো জিতেছেন এবং খেলার গতি ও দিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন, বল পাসের পাশাপাশি আক্রমণের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ফরোয়ার্ড হয়েও নিচে নেমে এসে মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করেছেন ওয়ারসাবাল। তাতে মাঝখানে খেলোয়াড় বাড়ার সুবিধা পায় স্পেন। রোদ্রি, রুইস, ওলমো আর নিচে নেমে আসা ওয়ারসাবাল ও বায়েনার জন্য চুয়ামেনি এবং রাবিও কোণঠাসা হয়েছিলেন। এজন্য মাঝখানে সবসময়ই একজন স্প্যানিশ খেলোয়াড় ফাঁকায় থাকছিলেন আক্রমণ করার জন্য। এ কৌশলই ফরাসি মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের যোগাযোগের রাস্তাটি পুরোপুরি কেটে দেয়।
কার্ড দেখায় রাবিওকে বিরতির পর তুলে নেওয়া হলে মাঝমাঠের যে বাড়তি একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন ছিল, সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি ফ্রান্সের। তাতে স্পেন তাদের দাপট বজায় রাখে। ২২ মিনিটে ওয়ারসাবাল পেনাল্টি থেকে গোল করেন দিনিয়ের শিশুতোষ ভুলে। বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে ইয়ামাল সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় আগে তার সামনে চলে আসেন। দিনিয়ে সেটি খেয়াল না করেই লাথি মেরে বসেন!
বিরতির পর স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে তাড়াহুড়ো না করে তিব্বতি ভিক্ষুদের মতো ধৈর্য ধরেন। ফ্রান্সের দুর্বলতম জায়গাটি ছিল তাদের লেফটব্যাক পজেশন। ডিফেন্ডার দিনিয়ে সেই পেনাল্টির সময় যেমন অপ্রস্তুত ছিলেন, তেমনি ৫৮ মিনিটে পেদ্রো পোরোর গোলের সময়ও ছিলেন পুরোপুরি অসচেতন। এ ছাড়া দানি ওলমোকে মার্কিং করা ছেড়ে দিয়ে বিপদ ডেকে এনেছিলেন উপামেকানোও। বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষের ভুলের এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েই ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন। দলে তারকা না থাকলেও ফুটবল আকাশটা এভাবেই আলোকিত করছেন পোরো, ওয়ারসাবালরা।
০
লামিন ইয়ামাল স্পেনের হয়ে কখনো কোনো ম্যাচ হারেননি। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে তিনি যে ১২টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন (বদলি হয়ে খেলেছেন দুই ম্যাচ), তার প্রতিটিতেই দল জিতেছে।
৩
টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া হলো ফ্রান্সের।
৫
মিকেল ওয়ারসাবাল এ বিশ্বকাপে করেছেন ৫ গোল। বিশ্বকাপে এক আসরে ৫ বা তার বেশি গোল করা স্পেনের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার তিনি।
৩৭
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতালির টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছে স্পেন।




