অভাবেও সবুজ দেশ গড়ছেন বিষ্ণু হাজরা

সাইকেলে করে গাছ লাগাতে যান বিষ্ণু হাজরা রাজু
একসময় সংসারে একবেলা খেলে পরের বেলার খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। অভাবের কারণে দেওয়া হয়নি এসএসসি পরীক্ষা। জীবিকার তাগিদে কখনো চা-বাগানে শ্রমিকের কাজ, কখনো ভ্যানে চটপটি বিক্রি করেছেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। নিজের সীমিত আয়ের টাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার গাছ রোপণ এবং আরও ৭ হাজার গাছের চারা বিতরণ করে সবুজ পৃথিবী গড়ার এক নীরব আন্দোলনের নাম হয়ে উঠেছেন বিষ্ণু হাজরা রাজু (৪৩)। তিনি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা-বাগানের রামপাড়া শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা।
রাজু পেশায় চা-শ্রমিক। পাশাপাশি ভ্যানগাড়িতে চটপটি বিক্রি করে সংসার চালান। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ বৃক্ষপ্রেমী ও সমাজসেবক।
রাজু জানিয়েছেন, ১৯৯৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি টিউশনি করে প্রথম কয়েকটি গাছের চারা কিনেছিলেন। তখন থেকেই নিজের বাড়ি ও আশপাশে গাছ লাগানো শুরু। নবম শ্রেণিতে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৃক্ষ বন্দনা’ কবিতা এবং কৃষিশিক্ষা বই পড়ে তার মধ্যে বৃক্ষপ্রেম আরও জেগে ওঠে। এরপর আর থেমে থাকেননি।
গত তিন দশকে রাজু দেশের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, কবরস্থান, শ্মশান, চা-বাগান, বনাঞ্চল, রাস্তার দুই পাশ, পতিত জমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭ হাজার ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন।
শুধু গাছ রোপণ করেই থেমে থাকেননি; বিভিন্ন জাতীয় দিবস, জন্মদিন, বিয়ে, নবজাতকের জন্মসহ নানা উপলক্ষে প্রায় সাত হাজার গাছের চারা উপহার দিয়েছেন। রাজুর বিশ্বাস, একটি গাছও যদি বেঁচে থাকে, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
রাজু আরও জানালেন, ২০২০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভাড়াউড়া সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন। সংগঠনের মাধ্যমে শীতবস্ত্র বিতরণ, অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পাখির প্রতিও রয়েছে তার অগাধ ভালোবাসা। চা-বাগানের গাছে গাছে মাটির কলসি ঝুলিয়ে পাখির বাসা ও পানির ব্যবস্থা করেছেন। তার মতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে শুধু গাছ নয়, প্রাণীকেও ভালোবাসতে হবে।
জীবন অবশ্য সহজ ছিল না রাজুর। অর্থাভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয় এসএসসি পরীক্ষার আগেই। কখনো পত্রিকা বিলি করেছেন, কখনো বিক্রি করেছেন চটপটি, আবার শ্রমিকের কাজও করেছেন চা-বাগানে। কিন্তু সবসময় তিনি গাছ কেনার জন্য আলাদা করে রেখেছেন আয়ের একটি অংশ।
রাজু বলছিলেন, ‘অনেক সময় পরিবারের বাজারের টাকাও গাছ কিনতে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কখনো বাবা-মা কিংবা স্ত্রী নিরুৎসাহিত করেননি। বরং সবাই পাশে থেকেছেন।’




